লেবানন ও ইরান- এই দুই রণাঙ্গনে বর্তমানে এক অর্ধ-স্থবির যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে ইসরায়েল। তবে এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতাদের হাতে নয়, বরং নির্ধারিত হতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছায়। আল-জাজিরার কাছে এমনটাই দাবি করেছেন ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা।
ইরানের সঙ্গে নতুন দফার আলোচনার জন্য মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার যখন পাকিস্তানের পথে, সেখানে ইসরায়েলকে রাখা হয়নি। অন্যদিকে, গত বৃহস্পতিবার লেবাননে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৩ সপ্তাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। যদিও ইসরায়েল বারবার সেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, তবে বিশ্লেষকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন এই বিষয়ে যে- নিজের মিত্রদের চেয়েও ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ এখন পরিস্থিতির ওপর অনেক বেশি জোরালো।
ইসরায়েলি নেতারা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরান এবং তার লেবাননি মিত্র হিজবুল্লাহকে বারবার ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করার পরও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যে ধরনের যুদ্ধের জন্য নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন, গত ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় তিনি সেই যুদ্ধ শুরুও করেছিলেন।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেই যুদ্ধের সমাপ্তি বা পরিণতি আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়টি ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। কারণ নেতানিয়াহু তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ইরানের ‘আয়াতুল্লাহ শাসনের হুমকির অবসান’ ঘটবে এবং হিজবুল্লাহকে চূড়ান্তভাবে ‘নিরস্ত্র’ করা হবে।
ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি এই পরিস্থিতিকে গাজা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইরান ও লেবানন উভয় ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে নিজের পথে চালানোর যে চেষ্টা নেতানিয়াহু করেছিলেন, তা ছিল একইসাথে দাম্ভিকতা ও সুবিধাবাদে পূর্ণ। তবে নেতানিয়াহু এমনটা করবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’
বর্তমানে ইসরায়েলের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত লেভি আরও বলেন, ‘এর কারণ আংশিকভাবে হলো, নেতানিয়াহু নিজের প্রচারণায় নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে—ওয়াশিংটনকে দিয়ে ইসরায়েল কী অর্জন করতে পারে এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র মিলে মধ্যপ্রাচ্যকে কতটা বদলে দিতে পারে। যদিও বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি। তবে তিনি এই প্রশাসনের মধ্যে একটি সুযোগও দেখেছিলেন, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো এতটাই দুর্বল যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এমন সব কাজ করতে বাধ্য করতে পারেন যা আগে সম্ভব ছিল না।’
হিজবুল্লাহ এবং ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনও টিকে আছে। এর মাঝেই ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরান ও লেবাননে জোড়া যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নেতানিয়াহুকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে, কারণ তিনিই ছিলেন এই যুদ্ধের প্রধান প্রবক্তা।
ট্রাম্পের লেবানন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগে ‘ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’-এর এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইসরায়েলি ইহুদি যুদ্ধের পক্ষে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হলেও তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিও ইসরায়েলে অজনপ্রিয় প্রমাণিত হয়েছে। হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের জরিপ অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলি এই অভিযান স্থগিতের বিপক্ষে।
মার্কিন-ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জরিপকারী ডাহলিয়া শিন্ডলিন বলেন, ‘একদিকে ইসরায়েলিরা, বিশেষ করে ইসরায়েলি ইহুদিরা ইরান ও লেবাননকে তাদের ‘চিরশত্রু’ হিসেবে দেখে। তারা মনে করে তারা এমন এক অঞ্চলে বাস করে যেখানে শত্রুরা সবদিক থেকে ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে চায়। এটি তাদের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি আরও জানান, ইসরায়েল সরকার নিজের শর্তে সব চালাতে পারবে—এমন আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে এখন খুবই কম। একজন অস্থিরচিত্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে নির্ধারিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। শিন্ডলিন বলেন, ‘আমেরিকা অনেক বেশি শক্তিশালী অংশীদার। তাই সবাই বোঝে যে ওয়াশিংটনই শেষ পর্যন্ত ঘটনাবলি নিয়ন্ত্রণ করে। ইসরায়েলের হয়তো বলার মতো কিছু কথা বা প্রভাব আছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। এই ধারণাটি এখন ক্রমেই প্রবল হচ্ছে।’
ট্রাম্প লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান ও মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির চেয়ারম্যান গাদি আইজেনকোট বলেন, গত আড়াই বছর ধরে ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধবিরতি "চাপিয়ে দেওয়ার" যে ধারা চলছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা।
সমালোচকরা অবশ্য মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে দমানোর জন্য খুব সামান্যই করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের আক্রমণকে সমর্থন দিয়েছে। তবে আইজেনকোটের মূল লক্ষ্য ছিল নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু ‘সামরিক সাফল্যকে কূটনৈতিক বিজয়ে রূপান্তর করতে পারেননি।’
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিডও একইভাবে সমালোচনা করে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রথমবার নয়, এই সরকারের সব প্রতিশ্রুতি আবারও বাস্তবতার কঠিন মাটিতে আছড়ে পড়ছে।’
নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক কনসাল জেনারেল অ্যালন পিনকাস নেতানিয়াহুর বর্তমান দুর্দশা সম্পর্কে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, ইরানি শাসন এখনও টিকে আছে, তাদের ইউরেনিয়াম দেশেই রয়ে গেছে, আইআরজিসি (রেভোলিউশনারি গার্ড) আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে এবং ট্রাম্প এখন এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যেতে চান। ইসরায়েল সামরিকভাবে যাই অর্জন করুক না কেন, কৌশলগতভাবে এটি একটি পরাজয়।’
পিনকাস আরও যোগ করেন, ‘আমি সত্যিই জানি না ট্রাম্প আদতে নেতানিয়াহুর ভাগ্যে কী ঘটছে তা নিয়ে পরোয়া করেন কি না।’
তিনি উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে কারসাজি করে যুদ্ধে নামিয়েছেন—এমন খবরের পর ট্রাম্পের জন্য নেতানিয়াহুর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে লাভজনকও হতে পারে। পিনকাস বলেন, ‘ট্রাম্প ইরানের সাথে একটি চুক্তি চান। আর সেই চুক্তিতে যদি ইসরায়েল ক্ষতিগ্রস্তও হয়, ট্রাম্পের তাতে কিছুই যায় আসে না।’