থানায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা

ছাত্রদলের ১২ জনের নামে মামলার প্রস্তুতি

রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকরা। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার ওই হামলায় অন্তত ১০ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা) সদস্য। হামলা চলাকালে পুলিশের নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় ছাত্রদলের ১২ জনের নাম উল্লেখ করে ডুজার পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

হামলায় আহতরা হলেন ডুজা সভাপতি কালের কণ্ঠের মানজুর হোছাঈন মাহি, ডুজা সেক্রেটারি আগামীর সময়ের লিটন ইসলাম, দপ্তর সম্পাদক দেশ রূপান্তরের খালিদ হাসান, অর্থসম্পাদক ডেইলি অবজারভারের নাইমুর রহমান ইমন, রাইজিংবিডির সৌরভ ইসলাম, ঢাকা ট্রিবিউনের শামসুদ্দৌজা নবাব, ঢাকা মেইলের মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন সিফাত, নয়া দিগন্তের হারুন ইসলাম ও মানবজমিনের আসাদুজ্জামান খান। এদের মধ্যে ইফতেখার হোসেন সিফাত চোখে এবং মুখে গুরুতর আহত হন। তিনিসহ চারজন ঢামেকে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার পরে ওই দিন সন্ধ্যায় শাহবাগ থানার ভেতরে হামলার শিকার হন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারী (এবি জুবায়ের), সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ ও কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা। ঘটনার পর এবি জুবায়ের ও মুসাদ্দিককে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত সোয়া ৯টার দিকে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে ডাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীরা শাহবাগ থানার সামনে আসেন। সেখানে অবস্থানরত ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মুখোমুখি হলে এ অবস্থার সৃষ্টি  হয়। ডাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে পানির বোতল ছুড়ে কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসুতে নির্বাচন করা আবদুল্লাহ আল মাহমুদের নামে একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে আবদুল্লাহ অভিযোগ অস্বীকার করে একটি পোস্ট দিয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে শাহবাগ থানায় নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করতে যান। এ সময় জাগো নিউজের ঢাবি প্রতিনিধি ফেরদৌস ও রাইজিংবিডির সৌরভ ইসলাম ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাদের ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী বাধা দেন। এর প্রতিবাদ জানান ডুজা সভাপতি মানজুর হোছাঈন মাহি। এ সময় মাহিকে ছাত্রদলের সাবেক সহ-স্কুল সম্পাদকবিষয়ক সম্পাদক ওবায়দুর রহমান সামিথ গালাগাল করেন। পরে অন্য সাংবাদিকরা থানায় উপস্থিত হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুজর গিফারী ইফাত হঠাৎ মব সৃষ্টি করেন এবং ছাত্রদলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী সাংবাদিকদের ওপর হামলে পড়েন। এ সময় পুলিশকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

ছাত্রদলের দুঃখ প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন : এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট দিয়ে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সাংবাদিক সমিতির ভূমিকা ছিল অসামান্য। আমরা আশা করছি, ভবিষ্যতে আর কোনো সাংবাদিক যাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার না হন। এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার বিকেলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি জহির রায়হান আহমেদ, এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নাছির উদ্দিন শাওনের নেতৃত্বে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে লিখিত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ঢাবি প্রশাসনের পৃথক দুই কমিটি : উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুব কায়সারকে আহ্বায়ক করে গঠিত ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তা ছাড়া সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ঘটনার তদন্তে হলের আবাসিক শিক্ষক ড. মো. আনোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে ইতিমধ্যে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

হামলাকারীদের স্থায়ী বহিষ্কার দাবি : গতকাল দুপুরে হামলাকারী ছাত্রদল নেতাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার ও সনদপত্র বাতিলের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বরাবর অভিযোগ দিয়েছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি’। সব হামলাকারীর পরিচয় শনাক্ত করে তাদেরও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি তুলেছে তারা।

বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা : সাংবাাদিকদের ওপর হামলা ঘটনায় ঢাবি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। গতকাল রাত সাড়ে ৮টায় তারা মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান। এ ছাড়া এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), সোচ্চার টর্চার ওয়াচডগ বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ছাত্র অধিকার পরিষদ, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সার্বিক বিষয়ে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।