দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর ও জটিল বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একদিকে আমরা জাতীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির সুফল হিসেবে প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। বিশ^ব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে, দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের নাজুক চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, দেশের বর্তমান ব্যবসায়িক কাঠামো কেন কর্মসংস্থানমুখী হতে পারছে না এবং কেন এটি শ্রমবাজারের নতুন মুখদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রায় ২০ লাখ নতুন জনশক্তি যুক্ত হচ্ছে। অথচ এর বিপরীতে প্রতি বছর গড়ে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে মাত্র ৯ লাখ। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ১১ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে এসেও, স্থায়ী বা মানসম্মত কাজের সুযোগ পাচ্ছে না। এই ব্যবধান কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করছে না, বরং দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। গত এক দশকে দেশে গড়ে ৬ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেও, সেই প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্যবসায়িক পরিবেশের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে উচ্চ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যয় বা ‘রেগুলেটরি বার্ডেন’কে দায়ী করা হয়েছে। একটি নতুন ব্যবসা শুরু বা পরিচালনা করতে গিয়ে, উদ্যোক্তাদের যে পরিমাণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সময়ের অপচয় করতে হয়, তা আধুনিক অর্থনীতির যুগে অবিশ্বাস্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে একটি অপারেটিং লাইসেন্স পেতে গড়ে ২৮ দিন সময় লাগে এবং নির্মাণ-সংক্রান্ত অনুমতি পেতে সময় লাগে প্রায় ৪৯ দিন। যেখানে চীন বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে এ সময় অনেক কম। আমদানির ক্ষেত্রের চিত্র প্রায় একই রকম। একটি আমদানি লাইসেন্স পেতে বাংলাদেশে গড়ে ৪৯ দিন ব্যয় করতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল সময় নষ্ট করে না, বরং ব্যবসার প্রাথমিক খরচ এবং অনিশ্চয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের শুরুতে নিরুৎসাহিত করে। আমাদের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হিসেবে ‘উৎপাদনশীলতার বৈপরীত্য’ বা প্যারাডক্সকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কোম্পানি পর্যায়ে উদ্ভাবন বা ব্যাপকভিত্তিক গতিশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বর্তমানে আনুষ্ঠানিক খাতের মাত্র ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা চীন বা ভিয়েতনামের তুলনায় কয়েক গুণ কম। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণও জিডিপির ১ শতাংশের নিচে। বৈশ্বিক মানদণ্ডে তা অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে। অধিকাংশ বিনিয়োগ এখন উৎপাদনমুখী খাতের চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ইউটিলিটি খাতে বেশি হচ্ছে, ফলে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
দেশের বেসরকারি খাতে প্রকট ‘দ্বৈত কাঠামো’ গড়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে, মুষ্টিমেয় কিছু উচ্চ উৎপাদনশীল বড় প্রতিষ্ঠান, যারা মোট আনুষ্ঠানিক খাতের রাজস্বের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিশাল আয়ের মালিক হলেও, তারা দেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১৫ শতাংশ তৈরি করছে। বিপরীতে দেশের সিংহভাগ কর্মসংস্থান তৈরি করে, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ব্যবসাগুলো। যারা প্রতিনিয়ত নীতিগত বৈষম্য এবং প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের শিকার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে এই বৈষম্য অত্যন্ত স্পষ্ট; বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশ সুবিধা ভোগ করলেও, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় হওয়ার সুযোগ না থাকায়, কর্মসংস্থান সংকট কাটানো সম্ভব হচ্ছে না।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ব্যবসায়িক পরিবেশকে কতটা বিষিয়ে তুলছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে ব্যয় হওয়া সময়ের পরিসংখ্যানে। শীর্ষ ব্যবস্থাপকদের সময়ের একটি বড় অংশ চলে যায়, নিয়মকানুন পরিপালন ও কর্মকর্তাদের তদারকি সামলাতে। প্রতিবেদনে এটিকে ‘টাইম ট্যাক্স’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অবকাঠামো ও অর্থায়নের ঘাটতি বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে ২৮ বার উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক বিক্রয় প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তারা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, রপ্তানিমুখী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত কম সুদে ঋণ পেলেও, সাধারণ উদ্যোক্তাদের ১৩ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদ গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে মাত্র ৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছে, যার অভাব তাদের উৎপাদনশীলতাকে সাড়ে ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিচ্ছে।
সংকট থেকে উত্তরণে বিশ্বব্যাংক একটি তিন স্তরের ‘স্মার্ট ডি- রেগুলেশন’ মডেলের প্রস্তাব করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কমানো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলধারায় আনতে, কর ছাড়ের মতো প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। মধ্যমেয়াদি সংস্কারের আওতায় বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য, ডিজিটাল ব্যবস্থা ও বিশেষায়িত আদালত স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমিয়ে ‘জাতীয় শুল্ক নীতি’ বাস্তবায়ন করা জরুরি। বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘সাপ্লায়ার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ চালু করা যেতে পারে, যাতে তারা বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সম্মিলিতভাবে বিকাশের সুযোগ পায়। উচ্চ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যয় কমিয়ে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে সাহসী নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশ তার বিপুল জনশক্তিকে প্রকৃত সম্পদে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে।
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক
khosru193@gmail.com