টিকে থাকার লড়াইয়ে এগিয়ে ইরান

ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ দুই দেশের চলমান উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। অবরোধের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ইরানি জাহাজ জব্দও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ইরান কতদিন এই নৌ-অবরোধ সামলাতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্রই বা চালিয়ে যেতে পারবে কত দিন? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, ইরান অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ছে। ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার হারাচ্ছে দেশটি। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই অবরোধ ইরানের বেশ ক্ষতি করছে ঠিকই, তবে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেশটির রয়েছে।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই অবরোধকে ‘জলদস্যুতার শামিল’ এবং ‘বেআইনি কাজ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এর জবাবে ইরান সব বিদেশি জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং কয়েকটি বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দও করেছে। এর আগে তারা কেবল নিজেদের জন্য ‘বন্ধুভাবাপন্ন’ দেশের জাহাজগুলোকে ওই পথে চলার অনুমতি দিত। সম্প্রতি ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ এক্সে বলেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিনা মূল্যে মেলে না। তিনি লেখেন, একদিকে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করা হবে, আর অন্যদিকে সবার জন্য বিনা মূল্যে নিরাপত্তা আশা করা হবে এমনটা হতে পারে না। পছন্দটা একদম পরিষ্কার : হয় সবার জন্য উন্মুক্ত তেলের বাজার, না হয় সবার জন্য বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি। তিনি আরও বলেন, জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে ইরান ও এর মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের নিশ্চিত ও স্থায়ী অবসানের ওপর।

কতটা ক্ষতি হচ্ছে ইরানের : ইরান সমুদ্রপথে তেল, গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিসহ ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এই বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এরপর থেকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই রয়েছে। তবে এই পথ দিয়ে তারা নিজেদের জ্বালানি পণ্য রপ্তানি চালিয়ে গেছে। ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বাণিজ্য ও তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের মতে, ইরান গত মার্চে প্রতিদিন গড়ে ১.৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। এপ্রিলে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১.৭১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে তারা। ২০২৫ সালে তাদের গড় রপ্তানি ছিল দিনে ১.৬৮ মিলিয়ন ব্যারেল।

গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইরান ৫৫.২২ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করেছে। গত এক মাসে ইরানের তিন ধরনের প্রধান তেলের (ইরানিয়ান লাইট, ইরানিয়ান হেভি এবং ফোরোজান ব্লেন্ড) দাম কোনো দিনই ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নামেনি। অনেক দিন এই দাম ১০০ ডলারও ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের হিসাব ধরলেও, চলমান তেল রপ্তানি থেকে গত এক মাসে ইরান অন্তত ৪.৯৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এর বিপরীতে, যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইরান তেল রপ্তানি থেকে দিনে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার আয় করত, যা মাসে দাঁড়ায় ৩ .৪৫ বিলিয়ন ডলার। সহজ কথায়, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় গত এক মাসে তেল রপ্তানি থেকে ইরান ৪০ শতাংশ বেশি আয় করেছে। আর এই আয় বন্ধ করাই ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের অন্যতম প্রধান কারণ।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার ১৪ এপ্রিল আল জাজিরাকে জানান, গত ছয় সপ্তাহে তেল রাজস্বের দিক থেকে ইরান লাভবান হয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের অবরোধের কারণে সেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। তবে তিনি আরও জানান, ইরান সম্ভবত ‘দীর্ঘমেয়াদি খেলার’ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা এ ধরনের সংঘাতের আভাস আগেই পেয়েছিল এবং সে অনুযায়ী কিছু প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে। তার মতে, নৌ-অবরোধ অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। তবে এই অবরোধ কতটা কার্যকর, বিপুল পরিমাণ ভাসমান তেলের জাহাজের মধ্যে কয়টি পার হতে পারছে এবং ট্রাম্প কত দিন এই অবরোধ টিকিয়ে রাখতে পারবেনতা এখনো অস্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্র কতদিন অবরোধ চালাতে পারবে : স্নাইডার জানান, আগামী ১ মে একটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন ট্রাম্প। কারণ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে কোনো সামরিক অভিযান চালানোর জন্য তার হাতে থাকা ৬০ দিনের সময়সীমা ওই দিন শেষ হবে। তিনি জানান, যেসব জাহাজের মাধ্যমে এই অবরোধ কার্যকর রাখা হচ্ছে, সেগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এ ছাড়া চীনের পণ্য বহনকারী জাহাজগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্র বারবার জব্দ করতে থাকে, তবে চীন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটাও দেখার বিষয়। স্নাইডার বলেন, চীন ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে, ইরানের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যে অবরোধ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর পাশাপাশি প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের খুব একটা ক্ষতি না করলেও, এই অঞ্চলে ও বিশ্বজুড়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ক্ষতি করছে। ফলে ট্রাম্পের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, দুই পক্ষের আচরণ থেকে যদি কিছু বোঝার থাকে, তবে তা হলোইরান ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে, আর ট্রাম্প ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছেন।

বাহরাইনে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যাডাম এরেলি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানিরা এই পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তাদের নিজেদের পরিকল্পনা আছে। তেল মজুদ বা বিক্রি করার বিকল্প উপায়ও তাদের হাতে আছে। তিনি বলেন, এমনকি তাদের তেল ফুরিয়ে গেলেও, এই কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে থাকার পথ তাদের জানা আছে। সত্যি বলতে, আমার মনে হয় ট্রাম্পের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলেও ইরানিরা ঠিকই টিকে থাকবে। অ্যাডাম আরও বলেন, ট্রাম্প সবসময়ই রাজনৈতিক হাওয়া বোঝেন। তাই একদিকে তার ইরান নীতি, অন্যদিকে তার নির্বাচনী কৌশলএই দুটির মধ্যে একটি বড় সংঘাত দেখা দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, শেষ পর্যন্ত তিনি কোনটিকে ছাড় দেবেন?

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এফজিই এনার্জির মতে, ইরানের দেশীয় শোধনাগারগুলোর উৎপাদনক্ষমতা দিনে ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল। তাদের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকেন্দ্রগুলো মূলত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশে অবস্থিততেলের জন্য খুজেস্তান এবং গ্যাস ও কনডেনসেটের জন্য বুশেহর। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে সাগরে প্রায় ১৮৩ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল ভাসছে। কেপলারের বিশ্লেষক মুয়ু জু আল জাজিরাকে জানান, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আগামী দিনে ইরানের তেল লোডিং ও রপ্তানি ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ট্যাংকার ট্র্যাকার্স জানিয়েছে, তেলের মজুদ রাখার জায়গার অভাব হতে পারে এমনটা আঁচ করে ইরান খার্গ দ্বীপে ‘নাশা’ নামের পুরনো একটি ট্যাংকারকে আবার কাজে ফিরিয়ে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাগরে ইতিমধ্যে ট্রানজিটে থাকা তেলের মাধ্যমে ইরান আরও কয়েক মাস রাজস্ব আয় অব্যাহত রাখতে পারবে।

ওয়াশিংটন ডিসির কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের সাবেক ইরান বিশ্লেষক কেনেথ কাটজম্যান বলেন, এই মুহূর্তে বিশ্বের বিভিন্ন জাহাজে ইরানের প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্পের অবরোধ আরোপের আগেই এই সরবরাহগুলো হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। এগুলো এখন শত শত ট্যাংকারে করে ‘ডেলিভারির অপেক্ষায়’ রয়েছে। তিনি জানান, এক ইরানি অধ্যাপকের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন যে, এই সরবরাহগুলোর ওপর ভিত্তি করে নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও তেহরানের রাজস্ব প্রবাহ আগস্ট পর্যন্ত চলতে পারে। কাটজম্যান বলেন, এটি বেশ লম্বা সময়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কি আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময় আছে? সম্ভবত নেই।