ইভটিজিং প্রতিরোধে চাই সামাজিক উদ্যোগ

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবেই কিছু মৌলিক মানবাধিকার নিয়ে আসে। নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার তার মধ্যে একটি। এই অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকার কথা নয়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে ‘ইভটিজিং’ নামের এক ভয়াবহ ব্যাধির উদ্ভব হয়েছে। এর ফলে অনেক নারী নিজেদের অনিরাপদ, সীমাবদ্ধ ও এক ধরনের অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ মনে করেন, যা তাদের মনে ক্রমাগত ভয় ও অস্বস্তি তৈরি করে। এমনকি ‘ইভটিজিং’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই নারী ও তাদের অভিভাবকদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইভটিজিং বলতে সাধারণত নারীদের উদ্দেশ্যে অশালীন মন্তব্য, ইঙ্গিত, অনুসরণ করা কিংবা মানসিকভাবে হেনস্তা করাকে বোঝায়। অনেক সময় এটিকে তুচ্ছ ঘটনা হিসেবে দেখা হয় বা ‘মজা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি গুরুতর মানসিক নির্যাতন, যা ভুক্তভোগীর আত্মবিশ্বাস, স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সমস্যার পেছনে মূলত সামাজিক ও মানসিক কারণগুলোই বেশি দায়ী। পরিবারে সঠিক মূল্যবোধের অভাব, নারীর প্রতি অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া সব মিলিয়ে ইভটিজিং একটি স্বাভাবিক ঘটনার রূপ নিচ্ছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা লজ্জা বা সামাজিক চাপের কারণে প্রতিবাদ করতে পারেন না। ইভটিজিং রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে সামাজিক সচেতনতা ও উদ্যোগ।

পরিবার থেকেই সন্তানদের মধ্যে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর নীতিমালা এবং নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে ইতিবাচক প্রচারণা চালাতে হবে। এর পাশাপাশি আইনগত দিক থেকেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা সহজেই সহায়তা পেতে পারেন।

বর্তমান সময়ে ইভটিজিং শুধু রাস্তাঘাটেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অনলাইন মাধ্যমেও এর বিস্তার ঘটেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন বার্তা, ছবি বা মন্তব্যের মাধ্যমে নারীদের হেনস্তা করা হচ্ছে, যা একই সঙ্গে নিন্দনীয় এবং প্রতিরোধযোগ্য। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সচেতনতা ও নজরদারি বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণ সমাজ ও সহপাঠীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

বন্ধুমহলে কেউ যদি এ ধরনের আচরণ করে, তবে তাকে নিরুৎসাহিত করা এবং প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুরুষদের ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ সমাজ পরিবর্তনে তাদের সচেতন অংশগ্রহণ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ইভটিজিং এমন একটি সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আমাদের মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নীরবতা ভেঙে সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুললেই কেবল আমরা একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারব।

লেখক : শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ