যুগ পার হলো, বিচারের চূড়ান্ত হলো না

ঘটনাটি ঘটেছিল এক যুগ আগে। বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জে অপহরণ করা হয়েছিল সাতজনকে। তারপর তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল শীতলক্ষ্যা নদীতে। হত্যাকা-ে এলিট ফোর্স র‌্যাবের জড়িত থাকার খবর এসেছিল গণমাধ্যমে। সাত খুনের গা শিউরে ওঠার ঘটনা প্রকাশিত হয়েছিল বিদেশি গণমাধ্যমেও। তবে, দেশে-বিদেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ওই ঘটনায় দেশে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

২০১৭ সালে অধস্তন আদালতে ২৬ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় হয়েছিল। একই বছরের আগস্টে ১৫ জনের মৃত্যুদ- বহাল রেখে এবং ১১ জন আসামিকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। এরপর মামলাটি সাড়ে আট বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে আপিল বিভাগে।

গত বছরের অক্টোবরে মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসার পর ২১ অক্টোবর আসামিপক্ষকে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে নির্দেশ দিয়ে শুনানির জন্য এক মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। জানা গেছে, আসামিপক্ষে কেউ সারসংক্ষেপ জমা দেয়নি। ফলে আপিল শুনানি কবে শুরু হবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা তা জানাতে পারেননি। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, ‘আসামিপক্ষ সারসংক্ষেপ জমা দিলে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের কাজ শুরু করবে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, মামলা নিষ্পত্তিতে কোনো কোনো আসামির উদ্যোগ নেই। ফলে বিচারের নিষ্পত্তি হচ্ছে না।’

নৃশংস সেই সময় : মামলার অভিযোগপত্র, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও সাক্ষীদের বক্তব্যে সাত খুনের নৃশংসতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডের লামাপাড়ায় র‌্যাবের কিছু সদস্য চেকপোস্ট বসায়। একপর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ২ নম্বর ওয়ার্ডের তখনকার কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র মো. নজরুল ইসলাম, তার তিন সহযোগী সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম এবং নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলমকে তুলে নিয়ে যায়। ওই পথে থাকা নজরুলের আইনজীবী চন্দন সরকার অপহরণের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে চিৎকার করতে থাকেন। পরে তাকে ও তার গাড়িচালক মো. ইব্রাহিমকেও তুলে নিয়ে যায় র‌্যাব। পরে সাতজনের মুখমন্ডলে পলিথিন পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। লাশ গুম ও আলামত নষ্ট করতে নিহতদের তলপেট কেটে লাশ বস্তায় ভরে ১০টি করে ইট বেঁধে শীতলক্ষ্যায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ৩০ এপ্রিল ছয়জন ও পরদিন আরও এককজনের লাশ নদীতে ভেসে ওঠে। এতে নারায়ণগঞ্জসহ গোটা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। হত্যকারীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার মানুষ টানা কয়েকদিন আন্দোলন করে; অবরোধও করেন তারা। ঘটনার মূলহোতা ছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নাসিকের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন। ঘটনার পর ভারতে পালিয়ে গেলেও ২০১৫ সালের নভেম্বরে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়।

এলাকায় আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার করতে নজরুলকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন নূর হোসেন। এ কাজে তিনি র‌্যাবকে ব্যবহার করেন; র‌্যাব-১১-এর তখনকার অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদসহ র‌্যাবের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওই কর্মে জড়িত ছিলেন।  

আইনি প্রক্রিয়ায় এক যুগ : ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাত খুনের মামলার রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদ-াদেশ দেয়। ১৬ জনই ছিলেন র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্য। সাজাপ্রাপ্তদের ১১ জন সেনাবাহিনীর, ২ জন নৌবাহিনীর, বিজিবির তিনজন, পুলিশের সাতজন এবং দুইজন ছিলেন আনসার বাহিনীর। তদন্তে নাম আসার পরই নিজ নিজ বাহিনী থেকে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। বিচারিক আদালতে ফাঁসির সাজা পাওয়া র‌্যাবের আসামিরা হলেন তারেক সাঈদ, মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানা এবং হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, সৈনিক আল আমিন শরীফ, সৈনিক তাজুল ইসলাম ও সার্জেন্ট এনামুল কবীর। ফাঁসির দ-প্রাপ্ত অন্যরা হলেন নূর হোসেন, তার সহযোগী মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী, আলী মোহাম্মদ, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান চার্চিল, সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, নূর হোসেনের ম্যানেজার শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন। বিচারিক আদালতে অপহরণ ও আলামত গোপনের অভিযোগে র‌্যাবের আরও ৯ জনকে ৭ থেকে ১০ বছরের কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়।

পরে হাইকোর্টে মামলাটির নিষ্পত্তি হয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফরেন্স ও দন্ডপ্রাপ্ত ২৮ আসামির আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট রায় দেয় হাইকোর্ট। রায়ে বিচারিক আদালতে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত ১৫ আসামির সাজা বহাল রাখার পাশাপাশি ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের রায়ে তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন, এম মাসুদ রানা, নূর হোসেন, বেলাল হোসেন, এমদাদুল হক, আরিফ হোসেন, হিরা মিয়া, আবু তৈয়ব আলী, মো. শিহাব উদ্দিন, পূর্ণেন্দু বালা, আবদুল আলিম, মহিউদ্দিন মুনশি, আল আমিন ও তাজুল ইসলামের ফাঁসির আদেশ হয়।

যাদের যাবজ্জীবন হয় তারা হলেন আসাদুজ্জামান নুর, এনামুল কবির, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান, রহম আলী, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান চার্চিল, সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান ও জামালউদ্দিন। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত ৯ জনের সাজা হাইকোর্টেও বহাল থাকে।

হাইকোর্টের সাজার বিরুদ্ধে আসামিদের পক্ষে আপিল বিভাগে মোট ১৫টি আপিল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান। ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত মহিউদ্দিন মুনসী, আল আমিন শরীফ ও তাজুল ইসলাম এবং ফাঁসির সাজা কমে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সানাউল্লাহ ছানা ও শাহজাহান এখনো পলাতক। বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত ৯ জন ইতিমধ্যে সাজা খেটে বেরিয়ে গেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত নূর হোসেনের আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনি আসামির পক্ষে সারসংক্ষেপ জমা দিয়েছেন। সব আসামির পক্ষে সারসংক্ষেপ জমা হয়েছে কি না, তার জানা নেই। তিনি বলেন, আপিল বিভাগে সাধারণত প্রধান বিচারপতি মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। তবে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তার কিছু জানা নেই।’

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি আরিফের আইনজীবী এস এম শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরিফের স্ত্রী বিদেশে থাকেন। তার পক্ষে মামলায় কেউ তদবির করতে আসেনি। আপিলের সারসংক্ষেপও দেওয়া হয়নি।’ 

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গতকাল দুপুরে তার কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘হাইকোর্ট কারও মৃত্যুদ- বহাল রাখলে তিনি সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপিল করতে পারেন। আমাদের তথ্য মতে, দন্ডিতরা আপিল করেছিলেন। আপিল বিভাগ সারসংক্ষেপ জমা দিতে বলেছিল।’ তিনি বলেন, ‘এ মামলায় আপিল কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়নি; করেছেন দন্ডিত ব্যক্তিরা। আপিল দায়ের করলে আপিলকারী পক্ষকে সারসংক্ষেপ জমা দিতে হয়, এটা বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা।’ ব্যারিস্টার কাজল বলেন, ‘আসামিপক্ষ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব আসবে। শুনানির উদ্যোগ আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে নেব।’

নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য : নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম রায় দ্রুত কার্যকর হবে। কিন্তু ১২ বছর পেরিয়ে গেছে তবু অগ্রগতি দেখছি না। আমাদের চরম অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে।’

নিহত তাজুলের বাবা আবুল খায়ের ও ভাই রাজু বলেন, ‘বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতে বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে মামলাটির অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিচার হবে। তার পুত্র তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী। আশা করছি, দ্রুত আপিলের নিষ্পত্তি হবে।’ 

‎‎নিহত গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বামীকে হারানোর সেই মর্মান্তিক সময়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ঘটনার মাত্র এক মাস পর জন্ম নেয় কন্যা রোজা আক্তার জান্নাত। এখন তার বয়স ১২ বছর। স্বামীকে হারানোর শোকের পাশাপাশি বিচার বিলম্বিত হওয়ায় হতাশ তিনি। রোজা জানায়, মাদ্রাসায় যখন তার সহপাঠীদের বাবারা তাদের আনতে বা দিতে যায় তখন সে বাবার অভাব বোধ করে।’