২০২৪ সালের জুলাই শহীদের সংখ্যা নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্কে অংশ নিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় এ প্রসঙ্গ নিয়ে বিতর্ক হয়। নৌ প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, কয়েক দিন ধরে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে খুব অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ১৮ মাস (অন্তর্বর্তী সরকারের সময়) যে আরামে ছিলেন, সেই আরাম এখন হচ্ছে না। এ কারণে অনেক সমস্যা হয়ে যাচ্ছে।
রাজিব আহসান বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে অন্তত তিনজন এমপি বক্তব্য দিয়েছেন। একজন বলেছেন ৮৪৪ জন শহীদ, একজন বলেছেনএক হাজারের ওপরে শহীদ আরেকজন বলেছেন ১ হাজার ৪০০ শহীদ হয়েছেন। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন হাসপাতালের সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে বলেছে ১ হাজার ৪০০-এর অধিক শহীদ হয়েছে এবং এটা জাতিসংঘও বলার চেষ্টা করেছে। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের গেজেটে ৮৪৪ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলের নেতা একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন-১ হাজার ৪০০ শহীদের মধ্যে ১ হাজার ২০০ শহীদের বাসায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তার। যখানে সরকারি গেজেটে ৮৪৪ জন শহীদ বলা হচ্ছে তিনি সেখানে ১ হাজার ৪০০ শহীদের মধ্যে ১ হাজার ২০০ শহীদের বাসায় কীভাবে গেলেন? তিনি বলেন, ‘এটা তো আমি বুঝতে পারতেছি না। উনি যদি যেয়ে থাকেন কোনো আপত্তি নাই, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আমরা প্রকৃত সংখ্যাটা জানতে চাই।’ তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন হয়েছে। এক বছর দুই বছর হয় নাই। এখনই স্মৃতির বিস্মৃতিতে অনেক কিছু হারিয়ে যদি যায়, ১০ বছর ২০ বছর পরে এই ইতিহাস বিকৃতি কোথায় গিয়ে পৌঁছবে? মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যে ধরনের একটি ব্যবসা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যে ব্যবসা গত ৫৪ বছর দেখতে হয়েছে, এই জুলাইকে কেন্দ্র করে নতুন করে ব্যবসা শুরু আমরা চাই না। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই ব্যবসা বন্ধ করার জন্য প্রকৃত ইতিহাস, কতজন শহীদ হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় আমরা জানতে চাই। প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী এটাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, আপনারা এখানে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলবেন, আমরাও শুনতে চাই, আমরাও কাজ করতে চাই আপনাদের সঙ্গে। কিন্তু যারা কুৎসা রটনা করছেন, আমরা দেখলাম আপনারা তাদের পুরস্কৃত করেছেন। যিনি অশ্লীল মন্তব্য করেছেন তার পরিবারের সদস্যকে এমপিকে করে কি প্রমাণ করতে চান?
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান প্রতমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, প্রতিমন্ত্রী বলেছেন শহীদদের সংখ্যা যদি ৮০০ প্লাস হয়, তাহলে আমি ১ হাজার ২০০ বাড়িতে গেলাম কীভাবে? ফ্যামিলিতে গেলাম কীভাবে?
সংসদের সবার দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তিনি কোনো বানোয়াট কথা বলেননি। এ বিষয়ে তাদের কাছে একটা কমপ্লিট প্রোফাইল আছে, এখানে উপস্থিত অনেকে সেই প্রোফাইল পেয়েছেন। জামায়াতের ওয়েবসাইটে এটা সচরাচর পাওয়া যাচ্ছে। চেক এবং ক্রস চেক করে নিশ্চিত হওয়ার পরেই এই তালিকা করা হয়েছে।
শফিকুর রহমান বলেন, দেশীয় কোনো সংস্থার উদ্ধৃতি নয়, জাতিসংঘের মানবাধিকার ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি বলেছে এ সংখ্যাটা ১৪শ জনের বেশি। বিভিন্ন জায়গায় যখন যাই কিছু মানুষ আসেন, তারা অসহায়ের মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এরপরে বলেন, ‘আমার বাবাটার কোনো খবর আপনাদের কাছে আছে কিনা?’ ওই যে দুইদিন ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষ খুন করে গুম করা হয়েছে, তাদের হিসাব তো কেউ দিচ্ছে না। এ সংখ্যা তো আরও বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপরে দেওয়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তথ্যটা তিনি তার সহকর্মীর কাছ থেকে যাচাই করতে পারেন। কারণ সুলতান সালাউদ্দিন টুকু নিজেই বলেছেন যে শুধু জাতীয়তাবাদী দল এবং তার অঙ্গ সংগঠনের লোকেরাই শহীদ হয়েছে ১ হাজারের ঊর্ধ্বে। তিনি বলেন, আমি যদি তার কথাটাই সমর্থন করি, তাহলে হিসাব এখান থেকেই তিনি পাবেন; আমার কাছে কষ্ট করে আসতে হবে না। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কথা বলব তখন আমাদের কথাগুলো যেন দায়িত্বশীল আচরণ হয়।