কিশোরগঞ্জ হাওরে দৃশ্য এখন বিভিন্ন হাওর থেকে নৌকাভর্তি ধানের বস্তা আসছে করিমগঞ্জ ও নিকলীর নৌঘাটে। তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বড় বড় আড়তে। তবে ধানের দাম শুনে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। কারণ তাদের জমিতে ধানের উৎপাদন খরচ ১২০০ টাকা আর বিক্রি করতে হচ্ছে ৭০০-৮০০ টাকায়। এমন নগদ লোকসানে কৃষকরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না।
এলাকার বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জেলার নাগচিন্নি নদের তীরে সারি সারি আড়তঘর। নদীতে নোঙর করা ধানবোঝাই নৌকা থেকে শ্রমিকরা বস্তা মাথায় করে আড়তে তুলছেন। সেখান থেকে আবার ট্রাকে করে ধান পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। একজন কৃষকের এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে ১২০০ টাকারও বেশি অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। এদিকে একজন শ্রমিককে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ধান কাটালে ওই শ্রমিককে দিতে হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
নিকলী উপজেলার ধারেশ^র গ্রামের কৃষক সুনাম উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, হাওরের কৃষক তাদের বছরের একটি মাত্র ফসল যা দিয়ে তাদের সারা বছর চলতে হয়। কিন্তু এত কষ্টের ফসলের দাম যদি পানির মতো হয় তাহলে আমাদের সন্তানদের নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।
এদিকে জেলার ইটনা উপজেলার মৃগা ইউনিয়নের কৃষক রুস্তম মিয়া বলেন, কৃষকরা আজ সবচেয়ে অবহেলিত, আমাদের দুঃখের কথা কেউ শোনে না। কৃষকরা এত কষ্ট করে ধান ফলায়, সেই ধান সস্তায় কিনে নিয়ে মিল আর চাতালের মালিকরা চালের দাম ঠিকই বাড়িয়ে দেয়। সস্তা এই ধানের সময়ে এখনো ২৫ কেজি চালের বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। ধানের দাম নেই, চালের দাম অনেক বাড়তি। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে নীতিনির্ধারকদের এই কথাটা মনে রাখতে হবে। আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলেন নিকলী উপজেলার মজলিশপুর এলাকার মিজান মিয়া।
ইটনা বড়িবাড়ি হাওর থেকে ৩০০ বস্তা ধান নিয়ে আসা কৃষক মালেক মিয়া বলেন, এবার তিনি প্রায় সাত একর জমিতে ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ ও হাইব্রিড হীরা জাতের ধান চাষ করেছেন। ব্রি-২৮ কিছুটা রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যগুলোর ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম না পেয়ে তিনি হতাশ। আড়তদাররা হাইব্রিড হীরা ধানের দাম দিচ্ছেন ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ। বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতি বছরই ধানের মূল্য কম থাকে। তবে এবারের মতো এত কম দাম আগে ছিল না।
নিয়ামতপুর এলাকার কৃষক মাসুদ মিয়া জানান, লাভ কম হওয়ায় এবার তিনি কম জমিতে চাষ করেছেন। তার ব্রি-২৯ জাতের ধান ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ বিক্রি করতে হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ১০০ টাকা কম। অথচ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ইটনা সদরের কৃষক কামরুল ইসলাম ১৫ একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি একরে ৭০ থেকে ৮০ মণ ধান উৎপাদন হলেও দাওয়াল, মাড়াই, পরিবহনসহ নানা খরচে অনেকটাই চলে যায়। শেষে খুব সামান্য লাভ থাকে।
কৃষক আবদুল হক বলেন, এক একর জমি পত্তন নিতে লাগে প্রায় সাত হাজার টাকা, শ্রমিক খরচ ছয় হাজার, চাষ দেড় হাজার, সার তিন থেকে চার হাজার, রোপণ দুই থেকে আড়াই হাজার, সেচ তিন থেকে চার হাজার টাকা। এত খরচ করে শেষে হাতে থাকে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। ধানের দাম না বাড়লে কৃষকের মরণ ছাড়া উপায় নেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে চাষ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন চাল পাওয়া যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, কিশোরগঞ্জ খাদ্যে উদ্বৃত্ত জেলা। এখানে বছরে প্রায় সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, ধানের দাম কম। আমরা উৎপাদন খরচের হিসাব করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। আমরা চাই, কৃষকরা যেন তাদের কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান। এবার ভালো ফলনে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। এক সপ্তাহ ধরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকদের প্রতি পরামর্শ থাকবে, জমির ধান ৮০ ভাগ পেকে গেলেই যেন কেটে ফেলেন। বলা যায় না, শিলাবৃষ্টি ও আগাম পানির কারণে তারা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।