হৃদয় জুড়ানো ব্যাটিংয়ে জয়

বাংলাদেশ বেশিরভাগ সময়ই হৃদয় জেতে কিন্তু ম্যাচ হেরে যায়। তীরে এসে তরী ডুবে, হৃদয় ভাঙার গল্প লেখা হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তাওহিদ হৃদয় সেই ধারাবাহিকতায় যতিচিহ্ন বসাতে চান। হৃদয় ভাঙার নয়, হৃদয় জেতার গল্পই লিখতে চান ব্যাটের কলমে, সবুজ মাঠের ক্যানভাসে। সেই প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সফল হৃদয়। ব্ল্যাকক্যাপদের ১৮২ রান তাড়া করে বাংলাদেশ জিতেছে ৬ উইকেটে, তাতে ২৭ বলে ৫১* রানের ইনিংস খেলে সমর্থকদের হৃদয় জিতেছেন বাংলাদেশের এ ব্যাটসম্যান।

দলের শীর্ষ ক্রিকেটারদের ছাড়াই বাংলাদেশে এসেছে নিউজিল্যান্ড দল, সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে মাঠে নামার আগে চোট পেয়ে বাইরে বসে থাকলেন অন্যতম অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ও এই সফরে ব্ল্যাকক্যাপদের অধিনায়ক টম ল্যাথামও। অনুশীলনের সময় পায়ের বুড়ো আঙুলে নখে বল লাগায় চোট পেয়েছেন ল্যাথাম, দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সিরিজের বাকি ম্যাচগুলোতে তিনি দলে থাকতে পারবেন কিনা, সেটা ম্যাচের আগে বোঝা যাবে। ব্ল্যাকক্যাপদের অধিনায়কের ভূমিকায় নাথান কেলি। টসে হেরে আগে ব্যাটিং করে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ ৬ উইকেটে ১৮২ রান। কিটন ক্লার্ক (৫১) ও ডেন ক্লিভারের (৫১) হাফসেঞ্চুরির সঙ্গে অধিনায়ক কেলির ৩৯ ও জশ ক্লার্কসনের ২৭ রানে নিউজিল্যান্ডের এই সংগ্রহ, ৩২ রানে ২ উইকেট নেন রিশাদ হোসেন। মূল জাতীয় দলের সঙ্গে প্রথম ম্যাচ খেললেন রিপন মন্ডল, এর আগে হাংজু এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করলেও সেই দলটা মূল দল ছিল না।

রান তাড়ায় তানজিদ তামিম ও সাইফ হাসানের শুরুটা ভালো হলেও তাদের জুটিটা বড় হয়নি। ১৬ বলে ১৭ রান করে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে বিদায় নেন সাইফ, ২৫ বলে ২০ রান করে আউট হয়ে যান তানজিদ হাসান তামিমও। প্রথমবার ডাক পেয়েছেন টেস্ট দলে, সে জন্যই কি টি-টোয়েন্টিতেও তার ব্যাটে টেস্ট ব্যাটিংয়ের ছাপ? ইনিংসের শুরুতে নেমে ২৫ বলে ২০, একটা মাত্র বাউন্ডারি তার ব্যাটে। ওয়ানডাউনে নেমে অধিনায়ক লিটন ১৫ বলে ২১ রান করে আউট হয়ে যান ইশ সোধির বলে। লেগসাইডে অনেকটা সরে এসে ইনসাইড আউট খেলতে গিয়েছিলেন লিটন, নিচে হওয়া সোজা বলটা মিস করতেই লিটনের স্টাম্প ভেঙে ছত্রখান।

 ১১ রানের ভেতর ২ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়া বাংলাদেশ দলকে আশার আলো দেখায় হৃদয়-ইমনের জুটি। বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে খেলতে শুরু করেন দুজনেই। ইমন ২ ছক্কা আর ১ চারে ২৮ রান করেন ১৪ বলে, জশ ক্লার্কসনের অফসাইডের অনেক বাইরের বলটা লং অফ দিয়ে উড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন। ব্যাটে-বলে হওয়ার মুহূর্তেই শরীরের ভারসাম্য হারান ইমন, মুহূর্তেই বুঝে যান পরিণতি কি হতে যাচ্ছে। তার বিদায়ে উইকেটে আসা শামীম খোলসবন্দি না থেকে আগ্রাসী ব্যাটিংই করেছেন, ১৩ বলে ৩ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায় অপরাজিত ৩১ রানের ইনিংস খেলে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শামীম পাটোয়ারী।

হৃদয় ছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়েরই হৃদয়। সিঙ্গেলস ডাবলসে রানের চাকা সচল রাখার পাশাপাশি বাউন্ডারিও বের করেছেন নিয়মিত। সোধি, ক্লার্কসন আর স্মিথের বলে মেরেছেন তার ইনিংসের ৩টা ছক্কা, বাউন্ডারি দুটো ফিশার আর লিস্টারের বলে। তার করা ১৮তম ওভারের শেষ বলে সিঙ্গেল নিয়েই হৃদয় নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের জয়।

 ২০২৬ সালের প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলতে নেমে জিতল বাংলাদেশ। জয়টা কাক্সিক্ষত, একই সঙ্গে স্বস্তিরও। কারণ লক্ষ্যটা আয়ত্তের একটু বাইরে গেলেই খোলসবন্দি হয়ে থাকার যে বদভ্যাস সেটা থেকে বের হয়ে এসেছেন নতুন প্রজন্মের ব্যাটসম্যানরা। ১২ বল হাতে রেখে ১৮৩ রান তাড়া করে জয়টা জানান দিচ্ছে, ব্যাটিং সামর্থ্যটা বেড়েছে। অধিনায়ক লিটনের কণ্ঠে ম্যাচশেষে সেই স্বস্তি, ‘হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই। আমার মনে হয় এটি একটি দারুণ ম্যাচ ছিল। আমাদের ব্যাটিং নিয়ে আমি খুবই সন্তুষ্ট, বিশেষ করে হৃদয়ের পারফরম্যান্স। সে এবং ইমন মাঝের ওভারগুলোতে খুব ভালো ব্যাট করেছে এবং শেষ দিকে শামীম ম্যাচটি শেষ করে দিয়েছে। পাওয়ারপ্লেতে মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে ১৮৩ রানের সংগ্রহ এই মাঠে অনেক বড় স্কোর, কারণ উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য মোটেও সহজ ছিল না; ইনিংস পরিবর্তনের সময় উইকেট কিছুটা ধীরগতির ছিল। আমি বলেছিলাম যে আমাদের পাওয়ারপ্লেতে রান প্রয়োজন। যদি শুরুতেই ভালো সংগ্রহ পাওয়া যায়, তবে মিডল অর্ডারের জন্য কাজটা সহজ হয়ে যায়। ইমন, হৃদয় ও শামীম যেভাবে ব্যাট করেছে, তাতে মনে হয়েছে কাজটা খুব সহজ ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল না।’

 নিউজিল্যান্ডের নতুন অধিনায়ক নিক কেলিও বললেন, একটা সময় জেতার সুবাস পেলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাই ম্যাচটা তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, ‘আমার মনে হয়েছিল ১৮০ রান সেই উইকেটে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক একটি স্কোর ছিল। ইনিংসের অর্ধেক পার হওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম, আমরা হয়তো এই মাঠের গড় রানের চেয়ে সামান্য এগিয়ে আছি। তাই ১৮০ রানে আমরা সন্তুষ্টই ছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটি যথেষ্ট ছিল না। ১০ ওভারের পর আমাদের মনে হয়েছিল আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। আমাদের মনে হয়েছিল সোধি তৃতীয় উইকেটটি নেওয়ার পর আমরা চালকের আসনে ছিলাম এবং ভেবেছিলাম হয়তো কয়েক ওভার আমরা চাপ ধরে রাখতে পারব। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তারা বেশ ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে মাঠে নেমেছিল এবং ব্যাটাররা একবার সেট হয়ে যাওয়ার পর তারা অনায়াসেই তাদের শটগুলো খেলতে পেরেছিল।’

অপরাজিত হাফসেঞ্চুরি ও শুরুতেই রানআউটে বাংলাদেশকে ব্রেক থ্রু দেওয়া হৃদয় হয়েছেন ম্যাচসেরা। ম্যাচের পর হৃদয় জানালেন, ‘আমি পরিস্থিতি বুঝে সেই অনুযায়ী খেলার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে রান প্রয়োজন, আর সে কারণেই আমি আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেছি।’ সেই সঙ্গে প্রশংসা করলেন সতীর্থ শামীমেরও, ‘শামীম দুর্দান্ত খেলেছে। সে ক্রিজে এসে অসাধারণ ক্রিকেট উপহার দিয়েছে’।

 তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথমটিতে ৬ উইকেটে জিতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। আগামীকাল বুধবার সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচটি হবে একই মাঠে। এরপর শেষ ম্যাচ ২ মে, ঢাকায় মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।