আশার পারদে উঠছে না ‘লিগ্যাল এইড’

দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিচারাধীন বা বিচারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে ৪৭ লাখের বেশি দেওয়ানি, ফৌজদারি ও অন্য মামলা। এসব মামলায় বিচারকাক্সক্ষীদের বড় অংশ অসচ্ছল ও অসহায়। মামলার জট কিংবা চাপ কমানো থেকে শুরু করে অসচ্ছল ও প্রান্তিক বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে সবচে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে সরকারি উদ্যোগে ‘লিগ্যাল এইড’ বা আইনগত সহায়তা। এর মূল লক্ষ্য, দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে আইনি সেবা পৌঁছে দেওয়া, যাদের আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য নেই।

মামলাসংক্রান্ত খরচ, দূরত্ব ও আইনি সচেতনতার অভাবে বিচারকাক্সক্ষী যাতে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করাই জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদানের মূল উদ্দেশ্য। তবে প্রচারের ঘাটতি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পক্ষগণের আস্থাহীনতা, ব্যক্তিগতভাবে মামলা পরিচালনাকে নিরাপদ মনে করা, লিগ্যাল এইডে অপ্রতুল বাজেট, প্যানেল আইনজীবীদের অপ্রতুল আর্থিক সুবিধা প্রভৃতি কারণে সেটি আশা অনুযায়ী হচ্ছে না বলে মনে করেন আইন বিশ্লেষকরা।

অসচ্ছল ও দরিদ্র বিচারপ্রার্থী জনগণকে আইনি সহায়তা দিতে সরকারিভাবে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে। ওই সময় জেলাপর্যায়ে লিগ্যাল এইড ফান্ড গঠন করে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়।

২০০০ সালে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন প্রণয়ন হয়। এ আইনের আওতায় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (এখন বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ সংস্থার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৯ সালে।

আইনি সেবা দিতে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটি রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টেও এ সংক্রান্ত একটি কমিটি রয়েছে। লিগ্যাল এইড কমিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং সরকার নির্ধারিত প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা নিশ্চিত করে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে অধিদপ্তরে উন্নীত করতে অধ্যাদেশ জারি হয়। লিগ্যাল এইড কার্যক্রমকে গতিশীল করতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এ অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরিত করে।

এর অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্রাম্যমাণ লিগ্যাল এইড ক্যাম্প উদ্বোধন করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় আইনি সহায়তা পৌঁছে দিতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা চাই, লিগ্যাল এইড সুবিধা দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাক।’

বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ সংক্রান্ত আইন হওয়ার পর থেকে গত ১৭ বছরে (২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত) জেলা লিগ্যাল এইড, সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড, সরকারি আইনি সহায়তায় হেল্পলাইন এবং ঢাকা চট্টগ্রাম শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেল থেকে সরকারিভাবে আইনি উপকারভোগী হয়েছেন ১৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন। সে হিসেবে বছরে গড়ে ৮৪ হাজার হাজার ৫৭২ জন আইনি উপকারভোগী হয়েছেন। অন্যদিকে মামলার বাইরে পক্ষগণের বিরোধ নিষ্পত্তির একটি সহজ, আধুনিক ও যুগোপযোগী পন্থা ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বা এডিআর। এ পদ্ধতিতে গত ১৭ বছরে প্রায় দুই লাখ মামলা বা বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যা আশানুরূপ নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এমন পরিস্থিতিতে আজ ২৮ এপ্রিল পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান’ দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ’। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, র‌্যালি, লিগ্যাল এইড মেলা প্রভৃতি কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, জাতীয় আইনি সহায়তা এখনো আশানুরূপ না হওয়ার বড় কারণ আর্থিক বরাদ্দের অপ্রতুলতা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৪ লাখ উপকারভোগী মানে হচ্ছে সরাসরি নয়, কেউ হয়তো পরামর্শ পেয়েছেন, কেউ হয়তো দিক নির্দেশনা পেয়েছেন। আবার কেউ সরাসরি আইনি সহায়তাও পেয়েছেন। তবে, এ সংখ্যা সন্তোষজনক নয়। এটি আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল।’ তিনি বলেন, ‘কত মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়া যাবে সেটি নির্ভর করে আর্থিক বাজেটের ওপর। লিগ্যাল এইডে মূল কাজটি করেন আইনজীবীরা। কিন্তু তাদের যে ফি দেওয়া হয়, সেটি যথেষ্ট নয়।’ তিনি বলেন, ‘বরাদ্দ যা আছে তা খুবই কম। বাজেট না বাড়লে আশানুরূপ অনুযায়ী হবে না, এটাই স্বাভাবিক।’ প্রসঙ্গত, বিগত আর্থিক বছরগুলোতে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল গড়ে ৩০ কোটি টাকা।

১৭ বছরে উপকারভোগী ১৪ লাখ : বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এ সংস্থার মাধ্যমে উপকারভোগী হয়েছেন ১৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন। অধিদপ্তরের উদ্যোগে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৬৪৩ মামলায়। আইনি সহায়তায় নিষ্পত্তি হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫৫ মামলা। এ সংস্থার একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর সেবা। সংস্থার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ বছরে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৯৯ বিরোধ (প্রি ও পোস্ট কেইস) নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যার মধ্যে এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তিকৃত বিরোধ বা মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৫৭টি। এডিআরের মাধ্যমে উপকারভোগী হয়েছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ৮৭৪ জন মানুষ। এ ছাড়া ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮২ জন এ সংস্থা থেকে আইনি পরামর্শ সেবা নিয়েছেন। ৪ লাখ ৬২ হাজার ৬৪৩ মামলায় আইনি সহায়তা দিয়েছে এ সংস্থা। এর মধ্যে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ২ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫৫।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির প্যানেল আইনজীবী হিসেবে প্রায় সাত বছর ধরে কাজ করছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লিগ্যাল এইড নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনো সচেতনতা, আস্থা ও প্রচারের ঘাটতি আছে। ব্যক্তিগতভাবে আইনজীবী নিয়োগ করলে মামলা নিজের পক্ষে আসে, আর সরকারি আইনজীবীরা আন্তরিকভাবে কাজ করবে না বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে এমন ধারণা কাজ করে। ফলে তারা অনেক সময় উৎসাহ পান না।’ অ্যাডভোকেট প্রশান্ত কর্মকার বলেন, ‘লিগ্যাল এইডের যেমন কিছু ব্যর্থতা আছে, তেমনি প্যানেল আইনজীবীদেরও কিছু দায় আছে। যদিও আইনজীবীরা যে সম্মানী পান তা যথেষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে আইনজীবীদের উচিত বিচারকাক্সক্ষীদের আস্থা অর্জন করা। আস্থা যেভাবে আসবে সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া সমীচীন।’

আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধিদপ্তর হওয়ার পর থেকে কর্মপরিধি বাড়ানো হয়েছে। সরকারও এ বিষয়ে আন্তরিক। আগামী কয়েক মাস আমাদের ব্যস্ত থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘যে সমস্যাগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে শিগগির কাজ শুরু করব। আশা করি, সমস্যাগুলো নিরসন করে বিচারপ্রার্থীদের আস্থা অর্জন ও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।’

কড়াইল বস্তিতে ভ্রাম্যমাণ লিগ্যাল এইড ক্যাম্প উদ্বোধন আইনমন্ত্রীর : রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্রাম্যমাণ লিগ্যাল এইড ক্যাম্প উদ্বোধন করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গতকাল সোমবার সকালে ক্যাম্প উদ্বোধনের আয়োজন করে আইন ও বিচার বিভাগ এবং বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর। এতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে জার্মান উন্নয়ন সংস্থা-জিআইজেড বাংলাদেশ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইন ও বিচারমন্ত্রী বলেন, ‘যাদের আইনি সহায়তা প্রয়োজন কিন্তু আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য নেই, তারা ১৬৬৯৯ নম্বরে কল করলেই সহায়তা পেতে পারেন।’ অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেন, ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার হাত ধরে বাংলাদেশে লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের সূচনা হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে অধিদপ্তরে উন্নীতকরণের অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

 সে সময় দুজন নারীকে তাৎক্ষণিক আইনি পরামর্শ প্রদান করেন আইনমন্ত্রী। একইসঙ্গে বস্তিবাসীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনে সেগুলো সমাধানের জন্য দিকনির্দেশনা দেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজ, লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসেন, আইন ও বিচার বিভাগের যুগ্মসচিব এম এ আউয়াল এবং জিআইজেড-বাংলাদেশের ক্লাস্টার কো-অর্ডিনেটর (গভর্ন্যান্স) ও হেড অব প্রোগ্রাম মার্টিনা বুকার্ড।