হরতাল করার সেই সুযোগ আমরা কাউকে দেব না

জনগণের শান্তি নষ্ট করে হরতাল করার সেই সুযোগ আমরা কাউকে দেব না। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ যদি ছিনিমিনি খেলতে চায়, চব্বিশের আগস্টের ৫ তারিখে যেভাবে বাংলাদেশের মানুষ জবাব দিয়েছে, ভবিষ্যতেও এ দেশের মানুষ সেভাবেই জবাব দেবে ইনশা আল্লাহ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল সোমবার বিকেলে যশোর ঈদগাহ ময়দানে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় এ কথা বলেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের প্রতি ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপিকে যারা ফ্যাসিবাদের দোসর বলে, তারই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করছে। যারা স্বৈরাচারের সঙ্গে ঢাকার বাইরে মিটিং করে তারা জনগণের জন্য কখনো কাজ করে না। যারা ১৯৭১, ২০০৮ সালে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, তারা ২০২৬ সালেও মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে করার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে নারীদের রান্নার কষ্ট লাঘবে ‘এলপিজি কার্ড’ দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড হাজার থেকে লাখ লাখ, এরপর লাখ লাখ থেকে কোটিতে পৌঁছাবে। এ ছাড়া বন্ধ অনেক কলকারখানা কয়েক মাসের মধ্যে চালু করবে সরকার। সরকার গঠনের পর গতকাল সোমবার প্রথমবার যশোর সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে তিনি খাল খনন কর্মসূচি, যশোর মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতাল উদ্বোধন, যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন এবং ঈদগাহ ময়দানে জনসভায় অংশ নেন।

জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণ সমর্থন দিয়েছে। বিএনপি তা বাস্তবায়ন করবে। দেশের মানুষের স্বার্থে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত কাজ শেষ করবে এই সরকার। দেশের জনগণই বিএনপির রাজনীতি। দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারীদের পেছনে ফেলে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বিএনপির ওপর দেশের মানুষের আস্থা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাধাগ্রস্ত করতে চায় একটি মহল, যারা নির্বাচনের আগে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ শান্তিতে ও ভালোভাবে বসবাস করতে চায়। জনগণ বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চায়। যারা স্বাধীনতার সময় জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিল, তারা এখনো জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়াবে, আর বিএনপি জনগণের জন্য কাজ করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখেছি আন্দোলনের নামে কীভাবে ১৭৩ দিন হরতাল করা হয়েছিল। মনে আছে আপনাদের ১৭৩ দিন কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখনো আবার সেই ভূত আরেকজনের কাঁধে গিয়ে আছর করেছে, আপনাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি সতর্ক থাকি এবং আমাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকি তাহলে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না।’

নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে তারেক রহমান জানান, বিএনপি সরকার দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত কাজ পূরণ করবে। তিনি বলেন, ‘মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে করব। শুধু মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা আমরা ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি করব না, একই সঙ্গে আমাদের যে মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করবে তাদের জন্য আমরা উপবৃত্তির ব্যবস্থা করব, যাতে তারা আরও উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে পারে।’

মা-বোনদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মা-বোনদের একটি কারণে খুব কষ্ট হয়, রান্নাবান্নার ব্যাপারে কষ্ট হয়; সেটি গ্রামের মা-বোনই হোক, সেটি শহরের মা-বোনই হোক। আমরা যেমন সারা দেশের মায়েদের কাছে যেমন ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিচ্ছি, সে রকম আরেকটি কাজ দিতে চাই সেটি হবে এলপিজি কার্ড। এলপিজি গ্যাস এটি আমরা মা-বোনদের পৌঁছে দেব, যাতে করে তাদের রান্নাবান্নার জন্য কষ্ট করতে না হয়।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকা থেকে যশোর বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। দুপুর ১২টায় শার্শায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলশী খাল পুনঃখননের উদ্বোধন করেন এবং সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন। দুপুর ২টায় তিনি যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেন।

খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ৫ বছরে আমরা সারা দেশে এই উলশী খালের মতো প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করতে চাই, যাতে গ্রামের মানুষ, কৃষক ভাই-বোনরা, এলাকাবাসী এবং তরুণরা বিভিন্ন রকম আয়-রোজগারের সুবিধা সেখান থেকে করতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই আমরা কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছি। এ ছাড়া বিভিন্ন চিনিকল ও কলকারখানা যেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বহু মানুষ বেকার হয়ে গিয়েছে, সেই কলকারখানাগুলো চালুর ব্যবস্থা ইনশা আল্লাহ আমরা করব। আগামী দুই-চার মাসের মধ্যে ইনশা আল্লাহ বাংলাদেশের অনেক বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা আবার চালু করা সম্ভব হবে, যার ফলে বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের অনেক দেশে জনশক্তি রপ্তানি সীমিত ও বন্ধ রয়েছে। সেসব দেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। দ্রুতই অনেক দেশে আমরা জনশক্তি রপ্তানিতে গতি আনতে পারব।

তিনি সব ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনসহ সব ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য সরকারিভাবে সম্মানীর ব্যবস্থা করব। আলহামদুলিল্লাহ, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আমরা ইতিমধ্যেই শুরু করেছি। দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে বিএনপি যতদিন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে, ইনশা আল্লাহ জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি জবান আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করব।’

জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন খোকন।

উলশী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন

যশোরের শার্শায় উলাশী উপজেলার বেতনা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত উলাশী-যদুনাথপুর এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানে খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে খালপাড়ে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খালটিকে খনন করেছিলেন। আমরা চার কিলোমিটারের এই খাল পুনঃখনন করব। আগামী ৫ বছরে আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করতে চাই। যাতে গ্রামে বসবাসকারী মানুষ সেখান থেকে আয় করতে পারে।’

যমেকে ৫০০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন

যশোর মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা প্রাইভেট পার্টনারশিপ তৈরির চেষ্টা করছি। সরকারি হাসপাতালে অনেক রোগী আসেন। অনেকে সেবা থেকে বঞ্চিত হন। কারণ হাসপাতালের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বাড়তি রোগী সামলানো সম্ভব হয় না। তাই প্রথম পর্যায়ে গুরুতর বিবেচনায় ভর্তি হওয়া রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর পরিকল্পনা করছি। প্রাইভেটে ভর্তি রোগীরা সরকারের খরচে চিকিৎসা পাবেন। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যেই এ পদ্ধতি আমরা চালু করতে চাই। এতে সরকার সবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারবে এবং একটি সুস্থ জাতি গঠনে তা সহায়ক হবে।’

পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন

বিকেল ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপমহাদেশের প্রাচীনতম জ্ঞানপীঠ যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই লাইব্রেরির দুষ্প্রাপ্য পা-ুলিপি শাখাটি ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি তুলট কাগজ ও তালপাতায় হাতে লেখা মহাকবি কালিদাসের পুঁথি, প্রাচীন রামায়ণ, মহাভারত এবং চাণক্যের কালজয়ী সৃষ্টিগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে প্রত্যক্ষ করেন। প্রায় পৌনে ২০০ বছরের প্রাচীন এসব অমূল্য সম্পদ দেখে প্রধানমন্ত্রী মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।

পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী যশোরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রাজ্ঞজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি লাইব্রেরির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে খুঁটিনাটি তথ্য জেনে নেন।