ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্ফোরণ সংগীত জগতকে এমন এক প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে ‘ভিউ’ বা ‘স্ট্রিম’ এখন সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। ইউটিউব, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শুধু গান শোনার মাধ্যম নয়, এগুলো এখন শিল্পীদের জনপ্রিয়তা, আয় ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে। তবে এই ভিউই কি একজন শিল্পী বা একটি গানের মানদণ্ড হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, বিশ্বব্যাপী সংগীতশিল্পে স্ট্রিমিং এখন সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সংগীত আয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ এসেছে স্ট্রিমিং থেকে। একইসঙ্গে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক স্ট্রিমিং সেবাই মোট আয়ের বড় অংশ দখল করেছে। শুধু প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারকারীর সংখ্যাই এ প্রবণতা স্পষ্ট করে।
উদাহরণস্বরূপ ২০২৫ সালের মার্চ মাসের তথ্যানুযায়ী, ইউটিউব মিউজিক ও ইউটিউব প্রিমিয়ামের বৈশ্বিক পেইড সাবস্ক্রাইবার বা অর্থ প্রদানকারী ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২৫ মিলিয়নের (১২.৫ কোটি) বেশি। মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮৬৮ মিলিয়নের বেশি। গত এক বছরে প্রতি মাসে গড়ে ২ মিলিয়ন নতুন পেইড সাবস্ক্রাইবার যুক্ত করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে এটি ১ বিলিয়ন সক্রিয় ব্যবহারকারীর মাইলফলকে পৌঁছাবে।
এদিকে, স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন ব্যবহারকারী বিশ্বজুড়ে ৭৫ কোটিরও বেশি। এ বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে গান যত বেশি শোনা হবে, তত বেশি আয়, জনপ্রিয়তা ও অ্যালগরিদমিক সুবিধা পাওয়া যাবে। আগে সংগীতের সাফল্য নির্ধারিত হতো অ্যালবাম বিক্রি বা রেডিও প্লের মাধ্যমে। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ইউটিউব ভিউ, স্পটিফাই স্ট্রিম ও টিকটক ভাইরালিটি।
গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গান ভাইরাল হলে তার স্ট্রিমিং চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে টিকটক একটি গানকে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে দিতে পারে। তবে এ প্রতিযোগিতার একটি কঠিন বাস্তবতাও আছে, অসংখ্য গান প্ল্যাটফর্মে আপলোড হলেও খুব কম সংখ্যকই জনপ্রিয়কা পায়।
এই ‘ভিউ’ বিষয়টি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ওপর প্রভাব ফেলছে। ডিজিটাল স্ট্রিমিং সংগীত শিল্পকে একদিকে যেমন পুনরুজ্জীবিত করেছে, অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। আগে অ্যালবাম বিক্রি থেকে সরাসরি আয় হতো, এখন আয়ের বড় অংশ নির্ভর করছে স্ট্রিমের সংখ্যার ওপর। এতে শিল্পদেরকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে ।
সংগীত বিশ্লেষকরা মনে করেন, ডিজিটাল যুগে ‘ভিউ’ একটি দ্বিমুখী তলোয়ার। একদিকে এটি সংগীতকে গণতান্ত্রিক করেছে, যেখানে নতুন শিল্পীরাও সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে এটি শিল্পকে ‘সংখ্যার খেলায়’ পরিণত করেছে, যেখানে সৃজনশীলতা পিছিয়ে পড়েছে।
অনেকে বলছেন, ভবিষ্যতে শিল্পীদের টিকে থাকতে হলে শুধু ভিউ নয়, বরং ফ্যান-এনগেজমেন্ট, ব্র্যান্ডিং এবং লাইভ পারফরম্যান্স, এ তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।