বিশ্ব অ্যাভিয়েশন খাতে জেট ফুয়েলের ঊর্ধ্বমূল্য নতুন সংকট নয় বরং এটি বহু এয়ালাইনসের পতন, পুনর্গঠন এবং অপারেশন সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটে কাঁপছে বৈশ্বিক অ্যাভিয়েশন। স্পিরিট এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লো-কস্ট এয়ারলাইনস। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে, জেট ফুয়েলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় এয়ারলাইনসটির পুনর্গঠনের পরিকল্পনা সংকটে পড়ে। অতিরিক্ত কয়েকশ মিলিয়ন ডলার জ্বালানি ব্যয়, তাদের দেউলিয়া অবস্থা থেকে বের আনা কঠিন করে তুলেছে। এমনকি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সেরা বাজেট এয়ারলাইনস হিসেবে, এয়ার এশিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায়, ধাপে ধাপে ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি রুট কমানো ও অপারেশন সংকোচন শুরু করেছে। এশিয়ার অন্য একটি বিমান সংস্থা, ভিয়েতনাম এয়ারলাইনস সংকটকালে মাসিক ফ্লাইট ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর পরিকল্পনা করেছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের সেরা ও জনপ্রিয় এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে লুফ্থানসা ও কেএলএম, ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় কিছু রুট অর্থনৈতিকভাবে অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে ফ্লাইট কমানো হয়েছে।
দূরপ্রাচ্যের বিমান সংস্থা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনসকে যুদ্ধের কারণে প্রায় ১,০০০ ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে জ্বালানি ব্যয় চাপের কারণে। ইজিজেট বিশ্ব আকাশ পরিবহনে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। যুদ্ধাবস্থার কারণে এয়ারলাইনসটি জেট ফুয়েলের দামে বড় ধাক্কা খেয়ে কয়েকশ মিলিয়ন পাউন্ড লোকসানের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। সার্বিকভাবে, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জেট ফুয়েলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে যা বিশ্বজুড়ে ফ্লাইট কমানো, ভাড়া বৃদ্ধি ও অপারেশন সংকোচনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংকটে থাকা বড় মার্কিন এয়ারলাইনসগুলো বিশেষ করে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস, আমেরিকান এয়ারলাইনস, ডেল্টা এয়ারলাইনস সাম্প্রতিক সময়ে শুধু জ্বালানি ব্যয়ের কারণে শত শত মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা রুট কমানো ও টিকিট মূল্য বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে ‘লো-কস্ট মডেল’ জ্বালানি দামের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হওয়ায়, এই ধরনের এয়ারলাইনসগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। জেট ফুয়েলের ঊর্ধ্বমূল্য কেন একটি এয়ারলাইনসকে ধ্বংস করে? : এয়ারলাইনসের খরচের বড় অংশ (৪০-৫০%) জ্বালানি খরচ হিসেবে বিবেচিত হয়। টিকিট মূল্য বাড়ালে চাহিদা কমে, ফলে সরাসরি আয়ের ওপর প্রভাব পড়ে। লো-কস্ট এয়ালাইনসগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তাদের অপারেশন খরচ নির্ভর করে জ্বালানি তেলের খরচের ওপর। জ্বালানি বাজার বৈশ্বিক, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। যুদ্ধ বা ভূ-রাজনীতি সরাসরি প্রভাব ফেলে জ্বালানির মূল্যের ওপর। বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাত এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন সম্ভাবনা ও সংকট দুটি বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একদিকে যাত্রী চাহিদা বাড়ছে, নতুন রুট চালুর সুযোগ তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে জেট ফুয়েলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, পুরো খাতটিকে চাপে ফেলেছে। এই দ্বৈত বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জ্বালানি ব্যয়।
জেট ফুয়েল, বিশেষ করে জেট এ-১, একটি এয়ারলাইনসের পরিচালন ব্যয়ের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত জুড়ে থাকে। ফলে মূল্য সামান্য বাড়লে প্রভাব পড়ে টিকিটের দাম, ফ্লাইট সংখ্যা, এমনকি এয়ারলাইনসের টিকে থাকার সক্ষমতার ওপরও। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে জেট ফুয়েলের মূল্য যেভাবে বেড়েছে, তা আঞ্চলিক বাজারের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়ার করপোরেশনের মূল্য নির্ধারণ নীতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও, অনেক সময় অভ্যন্তরীণ বাজারে তার প্রতিফলন তত দ্রুত দেখা যায় না। ফলে এয়ারলাইনসগুলোকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হতে হয়। যা তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাতে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং নভোএয়ার উল্লেখযোগ্য। এই এয়ারলাইনসগুলো ইতিমধ্যে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। কিন্তু যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নয়। উচ্চ জেট ফুয়েল মূল্যের বড় প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ওপর। টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায়, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য আকাশপথ ধীরে ধীরে বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে। ফলে যাত্রীসংখ্যা প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না, যা এয়ারলাইনসগুলোর আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলোকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বিদেশি ক্যারিয়ারদের সঙ্গে, যারা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি পায়। ফলে একই রুটে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলো, ভাড়ার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এয়ারলাইনসগুলো নানা সমস্যার মধ্যে থাকার পরও, সমাধানের পথ অজানা নয়। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও বাজারভিত্তিক নীতি প্রণয়ন দরকার। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও বাজারভিত্তিক নীতি প্রণয়ন জরুরি।
একাধিক সরবরাহকারীকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। এয়ারলাইনসগুলোর জন্য কর ও শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। যাতে তারা কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পায়। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তির দিকে নজর দেওয়া দরকার। বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সঠিক নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। অন্যথায়, জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্যই হয়ে উঠতে পারে এই সম্ভাবনাময় খাতের প্রধান অন্তরায়। বিশ্বের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে জেট ফুয়েলের ঊর্ধ্বমূল্য শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি এভিয়েশন খাতের ‘বেঁচে থাকা বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার’ প্রশ্ন। আজ স্পিরিট এয়ারলাইনস যেখানে দেউলিয়াত্বের কিনারায়, সেখানে অতীতে বহু এয়ারলাইনস ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। বড় এয়ারলাইনসগুলো টিকে থাকলেও ছোট ও লো-কস্ট ক্যারিয়ারগুলো দ্রুত ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা যদি জেট ফুয়েলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, নীতি সংস্কার এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে একই পরিণতি এড়ানো কঠিন হবে। আকাশে উড়তে চাইলে জ্বালানির ন্যায্য দাম শুধু অর্থনীতি নয়, নীতির প্রশ্নও।
লেখক : মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস