সভ্যতার দীর্ঘ অভিযাত্রায় গড়ে ওঠে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক সম্মিলন এবং সহাবস্থানের ভিত্তি। প্রাচীন সমাজের সহজ বিচারপ্রথা থেকে, আধুনিক রাষ্ট্রের জটিল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রতিটি পর্যায়ে ন্যায়বিচার মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতে নিহিত ন্যায্যতার আকাক্সক্ষা; অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জন্মায় স্বস্তি, বিশ্বাস এবং সামাজিক সংহতি। ন্যায়বিচারের শক্তি না থাকলে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শুধু কাঠামোবিহীন কাঠামোতে পরিণত হয়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে যে হামলা চালিয়েছে, তা শুধু সামরিক অভিযান নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিধর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের নগ্ন প্রদর্শন। হামলার লক্ষ্য ছিল, ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের হত্যা করা। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে ছিল। তাই এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের আত্মরক্ষার অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্বার্থরক্ষার সংজ্ঞা কি শুধুই মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে নির্ধারিত হবে? মধ্যযুগে শক্তির ভিত্তিতে দেশ দখল ছিল স্বাভাবিক; মানবতা, ন্যায়নীতি বা আন্তর্জাতিক আইন তখন ছিল না। বিস্ময়কর হলো মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের যুগে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর আচরণ খুব বদলায়নি। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, রাশিয়া ও চীনও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পথে এগোচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থরক্ষার নামে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন, তা বিশ্বরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক আইন এসব মূলত রাজনৈতিক বয়ান; প্রয়োজনে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আচরণ বিশ্বকে আবারও সেই পুরনো যুগে ফিরিয়ে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ইচ্ছামতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ইরাক, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে। শুধু এসব দেশই নয়, আরও বহু রাষ্ট্রে ক্ষমতা পরিবর্তন, অভ্যুত্থান ও প্রক্সি বাহিনী তৈরির মাধ্যমে, মার্কিন প্রভাব বিস্তারের ইতিহাস দীর্ঘ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উচ্চকণ্ঠ দাবি সত্ত্বেও বাস্তবে এসব দেশের বেশিরভাগই আজ চরম অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে। ইরানও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান আক্রমণের মূল উদ্দেশ্যও ভিন্ন নয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের কৌশলগত শক্তিধর মুসলিম প্রতিদ্বন্দ্বীকে দমন। ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করা এবং জ্বালানিভিত্তিক মার্কিন স্বার্থকে সুসংহত করা এই আগ্রাসনের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এরই মধ্যে বৈশি^ক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার প্রভাব বাংলাদেশে স্পষ্ট। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বিশেষ করে সৌদি আরব, ইউএই বা অন্যান্য আরব রাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। চীন যদি তাইওয়ান দখলের চেষ্টা করে, তবে এশিয়ায় নতুন সংঘাত সৃষ্টি হবে, যা বাংলাদেশের কাঁচামাল ও তৈরি পণ্যের সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। রাখাইন ইস্যুতে বাংলাদেশ জটিল অবস্থানে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা, যা আমাদের উন্নয়নকে সব সময় স্বস্তির চোখে দেখে না। এসব বিবেচনায় এখনই শক্তিশালী পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৭৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে, যা অর্থনীতিকে বিদেশনির্ভর করে তুলেছে। এই নির্ভরতা কমাতে স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। গার্মেন্টসের বাইরে এরই মধ্যে ফার্মাসিউটিক্যালস, হালকা প্রকৌশল, কৃষি যন্ত্রপাতি ও লেদার শিল্পে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারলে, যেকোনো বৈশি^ক অস্থিরতার মধ্যেও দেশে বড় ধরনের অরাজকতা এড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশ এরই মধ্যে মিঠা পানির মৎস্য উৎপাদনে বিশে^ তৃতীয়, গরু-ছাগল পালন, ডিম উৎপাদন এবং কোরবানির পশুর ক্ষেত্রে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়েছে। ফলে কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ও ব্যবসায় তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। কৃষি খাতে আমাদের সহজাত অভিজ্ঞতা, বাস্তব জ্ঞান এবং গ্রামীণ নারীদের অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে এই খাতকে আরও শক্তিশালী করার বড় সুযোগ রয়েছে। জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানির অভাবে জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই সরকারকে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপ সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো, বিশেষ করে ইরানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, ব্যয়বহুল অস্ত্রের পাশাপাশি কম খরচের ড্রোনও অত্যন্ত কার্যকর। শুধু ইরান নয়, আজারবাইজানও আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে ড্রোন ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
বিশ্ব এখন স্পষ্টভাবে মিসাইল ও ড্রোনভিত্তিক যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করেছে। আমাদেরকেও সেই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। বাংলাদেশের রয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা, যা বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস। এ ছাড়া প্রতি বছর প্রায় বিশ বর্গকিলোমিটার ভূমি আমাদের দেশের সঙ্গে যোগ হচ্ছে। উপকূল এলাকায় প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের মতো ভূমি জেগে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই জেগে ওঠা নতুন ভূমিকে সফল ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি করতে পারে। সমুদ্রসম্পদ, খনিজ, লবণ, মৎস্যসহ সব সম্পদের আহরণ ও অন্বেষণ, ব্লু ইকোনমিভিত্তিক পর্যটনসহ সব সুযোগ ও সম্ভাবনার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এই বিশাল জনসম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে, এটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বিদেশ থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা বিশ্বকে আবারও আগের যুগে ফিরিয়ে দিয়েছে, যেখানে শক্তিই ন্যায় নির্ধারণ করে। এই অস্থিরতায় আমাদের আরও সতর্ক, কৌশলী ও দূরদর্শী হতে হবে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে, ন্যায়বিচারের চেতনাকে জীবন্ত রাখার ওপর; যখন ন্যায়বিচার সক্রিয় থাকে, তখনই গণতন্ত্র সুস্থ এবং নাগরিকের আস্থা অটুট থাকে। বিশ্বরাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করেছে, শক্তিই ন্যায় নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ড।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
raihan567@yahoo.com