সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি সৌন্দর্য আছে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের যৌক্তিক ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, পারস্পরিক আলোচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং হারজিত মেনে প্রাণবন্ত বিতর্কের পরিবেশ বজায় থাকলে, সংসদে প্রাণ এবং সৌন্দর্য ফিরে আসে। বিরোধী দলের যৌক্তিক প্রস্তাব গ্রাহ্য করা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপট না দেখিয়ে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার চর্চা থাকলে সবর্দলীয় ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি থাকে। তখন গণতন্ত্র ও দেশবিরোধী কোনো শক্তি রাজনীতিতে অস্থিরতার সুযোগ পায় না। ফলে দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে সহজে এগিয়ে যায়। তখন সরকার বা নির্বাহী বিভাগ সরাসরি সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত না চাপিয়ে, সমঝোতা ও আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সংকট সমাধান করা যায়। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলছেন, ‘আমাদের মধ্যে অবশ্যই ভিন্নমত, ভিন্নপথ থাকবে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে উদ্দেশ্য এক এবং অভিন্ন। আমাদের সবার উদ্দেশ্য একটি উদার, গণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।’
সংসদ নেতা কেবল একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করেননি, সেখানে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য রাখার প্রস্তাব করে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন দলের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তারপরও সরকারি এবং বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন শুধু বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নয়, বিশ্বের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যে কারণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মনে করেন, ‘অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সংসদ কার্যকর ও প্রাণবন্ত। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মতভিন্নতা। এটি ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ একই কারণে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ‘সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের সরব উপস্থিতিতে সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। এখন পর্যন্ত সংসদ নিয়ে গণমানুষের যে প্রত্যাশা, তা পূরণ হতে চলেছে এটা বলা যায়।’ জামায়তে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার মনে করেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্রের মান বজায় রাখতে তার দলের এমপিরা চেষ্টা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সরকারি দল ও বিরোধী দল সবাই মিলে চেষ্টা করতে হবে।’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘আগের সংসদ ছিল একপাক্ষিক; এর কোনো জনসমর্থন ছিল না। সেদিক থেকে এই সংসদ অবশ্যই নির্বাচনী গণতন্ত্রের পথে একধাপ অগ্রগতি। এটি অংশগ্রহণমূলক। সংসদে অনেক গঠনমূলক আলোচনা হচ্ছে।’
জাতীয় সংসদে, বিভিন্ন দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যৌক্তিক কোনো কথা বা পরামর্শ বিরোধী দলের হলে, সরকারি দলের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে। এটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে অনুপস্থিত ছিল। রাজনীতির এই ঐক্যবদ্ধ ধারা অব্যাহত থাকলে, সর্বতোভাবে এটি সমাজের কাছে প্রশংসিত হবে। সংসদের বাইরে এসে, রাজপথের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। ফলে আশা করা যায়, জাতীয় রাজনীতিতে দ্রুত আরও শুদ্ধ পরিবর্তন দেখা যাবে। তখন ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিকে বিভ্রান্ত করা কঠিন হবে যা আমাদের আশান্বিত করে। অর্থবহ এবং শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য, কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ জরুরি। আকাক্সক্ষা থাকল, সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাকবে। অগণতান্ত্রিক শক্তি যেন, জোটবদ্ধ সংসদীয় গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিভ্রান্ত করতে না পারে।