বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্যতম শাইখুল হাদিস মাওলানা গোলাম মোস্তফা ইন্তেকাল করেছেন। গত শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি ১৯৩৯ সালে নেত্রকোনোর পূর্বধলার বিশকাকুনী ইউনিয়নের শরীফপুর-কলংকা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত দ্বীনি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা আবদুল জব্বার (রহ.)-এর স্নেহময় তত্ত্বাবধানে শৈশব থেকেই তিনি দ্বীনি শিক্ষার পথে অগ্রসর হন। তার ৮৭ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি অধ্যায়জুড়ে ছিল ইলম, আমল ও দ্বীনি খেদমতের উজ্জ্বল দীপ্তি।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসার প্রথম দিকের ছাত্র ছিলেন। সেখানে তিনি প্রখ্যাত আলেম, বিশেষ করে আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-সহ বহু মনীষীর সান্নিধ্যে ইলম অর্জন করেন। পরবর্তী সময় আল্লামা সাব্বির আহমদ উসমানি (রহ.) এবং সিলেটের খ্যাতিমান আলেম আল্লামা নূর উদ্দিন গহরপুরী (রহ.)-এর শাগরেদ হয়ে দ্বীনি জ্ঞানের গভীরতা ও পরিপক্বতা লাভ করেন। তার জীবন কেবল ব্যক্তিগত ইলম অর্জনে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন ইলমের প্রচার ও প্রসারে। জামিয়া ইমদাদিয়া দারুল উলুম, মুসলিম বাজার, মিরপুর মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন নায়েবে মুহতামিম ও শাইখুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অসংখ্য কিতাবের দরস দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন হাজারো আলেম। তার হাতে গড়া ছাত্ররা আজ দেশের নানা প্রান্তে দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত।
পূর্বধলার শরীফপুর-কলংকা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তার পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটি হয়ে ওঠে ইলমের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। সমাজে দ্বীনি শিক্ষার প্রসার এবং মানুষের নৈতিক উন্নয়নে তার অবদান ছিল অসামান্য।
তিনি ছাত্রদের কাছে খুবই আপন ছিলেন। স্নেহভাজন ‘নানা হুজুর’ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। কঠোরতার আড়ালে ছিল গভীর মমতা এবং শিক্ষাদানের ভেতরে ছিল আন্তরিক দরদ। ছাত্রদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সীমা ছাড়িয়ে এক আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ।
ইলমে তিনি ছিলেন গভীর, আমলে ছিলেন দৃঢ়, দুনিয়ার লোভ-লালসা থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। নিভৃতচারী এই মহান মানুষটি প্রচারবিমুখ থেকেও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিলেন। তার জীবনের সরলতা, নিষ্ঠা ও তাকওয়া ছিল অনুসরণীয় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার ইন্তেকালে দেশ হারালো এক নিবেদিতপ্রাণ আলেম, এক স্নেহময় অভিভাবক, এক আলোকবর্তিকা। ইলমের আকাশ থেকে যেন ঝরে পড়ল আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়, তার স্মৃতি রয়ে যাবে হাজারো ছাত্র ও ভক্তের হৃদয়ে।
তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী, পাঁচ পুত্র, আট কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ভক্তবৃন্দ। মহান আল্লাহ তার সকল গুনাহ মাফ করে তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা