কোরআনের ভাষাশৈলী মানুষকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে। কোরআন বিভিন্ন বিষয় মানুষকে উপমা ও রূপকের মাধ্যমে বুঝিয়েছে। কখনো একটি বৃক্ষের মাধ্যমে ইমানকে বুঝিয়েছে। কখনো বৃষ্টির পানিতে জন্ম নেওয়া সবুজ উদ্ভিদের মাধ্যমে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব তুলে ধরেছে। কখনো মাকড়সার দুর্বল ঘরের মাধ্যমে মিথ্যা আশ্রয়ের অসারতা দেখিয়েছে। এই উদাহরণগুলো চিন্তার দরজা খুলে দেয়। মানুষকে থামায়। ভাবতে শেখায়। নিজের অবস্থার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা করে।’ (সুরা হাশর ২১)
কোরআনের উপমাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো বিমূর্ত বিষয়কে দৃশ্যমান করে তোলে। ইমান হলো অদৃশ্য বিষয়ের প্রতি বিশ^াস। সুরা ইব্রাহিমে মহান আল্লাহ উত্তম বাণীকে (কালেমা তইয়্যিবা) একটি উত্তম বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখ না, আল্লাহ কীভাবে উপমা পেশ করেছেন? কালেমা তইয়্যিবা, যা একটি ভালো বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল সুদৃঢ় এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে।’ (সুরা ইব্রাহিম ২৪)
পরের আয়াতে বলা হয়েছে, সেই বৃক্ষ তার প্রতিপালকের অনুমতিতে সবসময় ফল দেয়। এই দৃষ্টান্তের মাধ্যমে ইমানের একটি পূর্ণ চিত্র সামনে আসে। ইমানের ভিত্তি দৃঢ় হলে তার প্রভাব মানুষের জীবনে প্রকাশ পায়। বিশ্বাস শুধু অন্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা কথা ও কাজে ফল দেয়।
এর বিপরীতে কোরআন মন্দ বাণী ও বাতিল বিশ্বাসকে এমন বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছে, যার কোনো দৃঢ় ভিত্তি নেই। সুরা ইব্রাহিমের ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মন্দ বাণীর দৃষ্টান্ত হলো মন্দ বৃক্ষের মতো। সেটিকে মাটি থেকে উপড়ে ফেলা হয়। তার কোনো স্থায়িত্ব নেই।’
এখানে উপমার মাধ্যমে একটি গভীর সত্য সহজ হয়ে যায়। সত্যের ভিত্তি আছে। মিথ্যার ভিত্তি নেই। সত্য স্থায়ী। বাতিল ক্ষণস্থায়ী।
কোরআনের আরেকটি অসাধারণ উপমা এসেছে দুনিয়ার জীবন প্রসঙ্গে। মানুষ দুনিয়ার চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়। সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা ও প্রাচুর্য তাকে মোহিত করে। কিন্তু কোরআন এই দীর্ঘ জীবনের আকাক্সক্ষাকে একটি ক্ষণস্থায়ী দৃশ্যের মাধ্যমে বুঝিয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় দুনিয়ার জীবনের তুলনা তো পানির ন্যায়, যা আমি আকাশ থেকে নাজিল করি, অতঃপর তার সঙ্গে জমিনের উদ্ভিদের মিশ্রণ ঘটে, যা মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তু ভোগ করে। অবশেষে যখন জমিন শোভিত ও সজ্জিত হয় এবং তার অধিবাসীরা মনে করে জমিনে উৎপন্ন ফসল করায়ত্ত করতে তারা সক্ষম, তখন তাতে রাতে কিংবা দিনে আমার আদেশ চলে আসে। অতঃপর আমি সেগুলোকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিই, মনে হয় গতকালও এখানে কিছু ছিল না। এভাবে আমি চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি।’ (সুরা ইউনুস ২৪)
কী অসাধারণ দৃশ্য! একটু বৃষ্টি। তারপর সবুজ হয়ে ওঠা জমিন। চারদিকে প্রাণের উচ্ছ্বাস। মানুষ মনে করছে, সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে। তারপর হঠাৎ সব শেষ। এই একটি দৃশ্যের মধ্যেই দুনিয়ার জীবনের প্রকৃতি ফুটে উঠেছে। সৌন্দর্য আছে। প্রাচুর্য আছে। কিন্তু স্থায়িত্ব নেই।
মহান আল্লাহ সুরা হাদিদের ২০ নম্বর আয়াতেও দুনিয়ার জীবনকে খেলাধুলা, বিনোদন, সাজসজ্জা, পারস্পরিক গর্ব এবং সম্পদ ও সন্তানের আধিক্যের প্রতিযোগিতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারপর বৃষ্টির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া উদ্ভিদের উদাহরণ দিয়েছেন। প্রথমে তা কৃষককে আনন্দ দেয়। পরে তা শুকিয়ে যায়। হলুদ হয়ে যায়। শেষে খড়কুটোয় পরিণত হয়। মানুষের জীবনের অনেক মোহও এমন। শুরুতে আকর্ষণ করে। পরে মøান হয়ে যায়। এক সময় স্মৃতিও হয়ে যায়।
কোরআনের উপমার আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো নৈতিক শিক্ষা। গিবত বা পরনিন্দার ভয়াবহতা বোঝাতে কোরআন এমন একটি উপমা দিয়েছে, যা শুনলেই মানুষের বিবেক কেঁপে ওঠে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’ (সুরা হুজুরাত ১২)
তারপর বলা হয়েছে, তোমরা তা অপছন্দ করো। এখানে গিবতের নৈতিক কদর্যতা বোঝাতে মৃত মানুষের গোশত খাওয়ার দৃশ্য সামনে আনা হয়েছে।
গিবত মুখের একটি কাজ। কিন্তু তার বাস্তবতা চোখে দেখা যায় না। কোরআন সেই অদৃশ্য পাপকে একটি দৃশ্যমান ও ভয়াবহ ছবিতে রূপ দিয়েছে। ফলে বিষয়টি বুদ্ধিতে ও অনুভূতিতে আঘাত করে।
মহান আল্লাহর পথে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কোরআন চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছে। সুরা বাকারার ২৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করে তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো। তা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রতিটি শীষে থাকে একশ দানা।’
একটি বীজ। তারপর বহু গুণ ফলন। এই দৃশ্যের মাধ্যমে দানের প্রতিদান মানুষের কাছে সহজ হয়ে ওঠে। একজন মানুষ সামান্য কিছু ব্যয় করলেও আল্লাহ চাইলে তার প্রতিদান বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারেন।
এর বিপরীত দিকও কোরআন অত্যন্ত চিত্রময়ভাবে তুলে ধরেছে। লোকদেখানো দানের উপমা এসেছে সুরা বাকারার ২৬৪ নম্বর আয়াতে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদকা বাতিল করো না সেই ব্যক্তির মতো, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখে না।’
লোকদেখানো আমলও এমন। বাইরে থেকে তা সুন্দর মনে হতে পারে। কিন্তু অন্তরে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি না থাকে, তাহলে তার সেই বাহ্যিক সৌন্দর্য কোনো উপকারে আসে না।
মিথ্যা আশ্রয়ের অসারতা বোঝাতে কোরআন মাকড়সার ঘরের উপমা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো। সে ঘর বানায়। অথচ ঘরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর।’ (সুরা আনকাবুত ৪১)
কোরআনের উপমার সৌন্দর্য এখানেই। একটি সাধারণ দৃশ্য গভীর সত্যের বাহক হয়ে ওঠে। কোরআনের উপমা কেবল সাহিত্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এগুলো মানুষের চিন্তা ও চরিত্র গঠনের মাধ্যম। এগুলো যুক্তিকে স্পর্শ করে। হৃদয়কে নাড়া দেয়। বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
কোরআনে রূপকের উদাহরণ হলো, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরি করে, তাদের অভিভাবক তাগুত (শয়তানসহ অন্যান্য উপাস্য)। তারা তাদের আলো থেকে অন্ধকারের দিকে বের করে নেয়।’ (সুরা বাকারা ২৫৭)
এখানে আলো ও অন্ধকার শুধু দৃশ্যমান আলো ও অন্ধকার নয়। আলো দ্বারা ইমান, হেদায়েত, সত্য ও সঠিক পথ বোঝানো হয়েছে। আর অন্ধকার দ্বারা কুফর, ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার অবস্থা বোঝানো হয়েছে। মানুষের অন্তরের একটি অদৃশ্য অবস্থাকে চোখে দেখা আলো ও অন্ধকারের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে হেদায়েতের অর্থ মানুষের কাছে আরও স্পষ্ট ও অনুভবযোগ্য হয়ে উঠেছে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের অন্তরে রোগ রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের রোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।’ (সুরা বাকারা ১০)
এখানে রোগ বলতে শারীরিক অসুস্থতা বোঝানো হয়নি। মুনাফিকি, সন্দেহ, সত্যের প্রতি অনীহা এবং অন্তরের
বিকৃতিকে রোগের রূপকে প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন শরীরের রোগ মানুষকে দুর্বল করে, তেমনি অন্তরের রোগ মানুষের ইমান ও নৈতিকতাকে দুর্বল করে। এই রূপকের মাধ্যমে কোরআন বুঝিয়ে দিয়েছে, মানুষের শরীরের যেমন চিকিৎসা প্রয়োজন, তেমনি অন্তরেরও আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন।
এই রূপকগুলোর বিশেষত্ব হলো, কোরআন বিমূর্ত বিষয়কে মানুষের পরিচিত জগতের ভাষায় অনুভবযোগ্য করে তুলেছে। ইমান হয়ে উঠেছে আলো, অন্তরের বিকৃতি হয়েছে রোগ। এখানেই কোরআনের রূপক ভাষার গভীর সৌন্দর্য।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক