২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে উত্তাল বাংলাদেশ। রাজপথে যখন সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরছিল, তখন দেশ থেকে দূরে তৎকালীন আওয়ামী লিগের সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসান। সেই সংকটময় সময়ে তার নীরবতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে আসা ‘হাসিখুশি’ ছবিগুলো দেশের মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
ক্রীড়া সাময়িকী স্পোর্টস্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা ও নিজের মানসিক অবস্থা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই ক্রিকেটার।
পেছন ফিরে তাকালে কি মনে হয় রাজনীতিতে আসা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি ক্যারিয়ার শেষ করে আসাটা ভালো হতো?
সাকিব আল হাসান: পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় অবসর নেওয়ার পরেই রাজনীতিতে আসা হয়তো আদর্শ হতো। তবে যখন আমি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিই, তখন আমার মাথায় পরিষ্কার ছিল যে ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিই হবে বাংলাদেশের হয়ে আমার শেষ টুর্নামেন্ট। সেই হিসেবে আমি এটাকে অবসরের পরবর্তী পরিকল্পনা হিসেবেই দেখেছিলাম। তাই সময়টা আমার কাছে সঠিক মনে হয়েছিল।
বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের কাজের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করেন। যেমন একজন ডাক্তার সেবার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেন। আমি আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ার এবং জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে মানুষের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছি। আমি মনে করি না পদ্ধতিটা ভুল ছিল, তবে মানুষের ভিন্ন মত থাকতেই পারে।
একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে ভালো মানুষরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। আপনার মতো একজন সফল মানুষ যখন রাজনীতিতে আসেন, আপনি কি মনে করেন এটি অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে?
সাকিব: সেই চিন্তাটা অবশ্যই আমার মনে ছিল। আমি সবসময়ই অনুভব করেছি যে ভালো মানুষরা যখন রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন, তখন ভুল ধরনের মানুষের জন্য জায়গা তৈরি হয়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি এটা নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছি।
এক পর্যায়ে মনে হয়েছিল যে কেউ রাজনীতিতে আসতে পারে এবং জনগণই ঠিক করবে তাদের প্রতিনিধি কে হবে। প্রথমে এভাবেই দেখেছিলাম। কিন্তু সময়ের সাথে বুঝেছি এটা এত সহজ নয়। সবকিছুই সাদা-কালো হয় না।
আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন খুব কম মানুষই ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নিত। আজ সেই ধারণা বদলেছে; অভিভাবকরা সন্তানদের খেলায় উৎসাহ দিচ্ছেন। একইভাবে আমি ভেবেছি কেন একজন সৎ, সুশৃঙ্খল এবং স্বনির্ভর মানুষ রাজনীতিতে এসে দেশের জন্য অবদান রাখার চেষ্টা করবে না? সেই ভাবনা থেকেই আমার এই সিদ্ধান্ত।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আপনি দেশের বাইরে ছিলেন। সেই সময়ে দেশে আপনার সম্পত্তির ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা যায়। আপনি সেই পরিস্থিতি কীভাবে সামলেছেন?
সাকিব: সেটি ছিল অত্যন্ত কঠিন এক সময়। সত্যি বলতে আমি তখন ঠিক জানতাম না কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাব—আমি অবাক হওয়ার চেয়েও বেশি স্তম্ভিত ছিলাম। জীবনে কখনও এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি, তাই এটি ছিল আমার কল্পনার বাইরে।
পরিবারের সমর্থন অনেক কাজে দিয়েছিল এবং আমি ক্রিকেটে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করেছি। কানাডায় ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট খেলার সময় চারপাশের গুঞ্জন এড়িয়ে খেলায় মন দেওয়া সহজ ছিল না। সেখানেও কিছু দর্শক প্রশ্ন তুলেছিল আমি দেশের জন্য কী করেছি। প্রায় দুই দশক দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার পর এমন প্রশ্নে কী উত্তর দেব জানা ছিল না। এখন মনে হয় সেগুলো ছিল পরিকল্পিত প্রতিবাদ।
এরপর আমি পাকিস্তানে সিরিজ খেললাম এবং ভারতে গেলাম। আমাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল আপাতত দেশের বাইরে খেলা চালিয়ে যেতে এবং দেশে না ফিরতে। পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক ছিল না। তবে আমি বিশ্বাস করি সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়। সময় ক্ষত সারিয়ে তোলে। তাই আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি এবং আশা করছি পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।
আপনি দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তা সম্ভব হয়নি। আপনি কি এখনো ঘরের দর্শকদের সামনে আবার খেলার স্বপ্ন দেখেন?
সাকিব: অবশ্যই। শুধু একটি ম্যাচ খেলে বিদায় নিতে চাই এমন নয়। আমি এখনো শারীরিকভাবে ফিট এবং বিশ্বাস করি আমার দেওয়ার মতো আরও অনেক কিছু আছে। আল্লাহর রহমতে সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে আমি ভালো করেছি, তাই সেই আত্মবিশ্বাস আছে।
আমি এমন পরিস্থিতিতে পড়তে চাই না যেখানে বিদায়ী ম্যাচের জন্য দলের ওপর বোঝা হয়ে থাকব। যতক্ষণ মনে হবে আমি অবদান রাখতে পারছি, আমি খেলা চালিয়ে যেতে চাই। পুরো ফিটনেসে ফিরতে আমার বড়জোর এক মাস সময় লাগবে, তবে ঘরের মাঠে আবারও খেলার ইচ্ছাটা সবসময়ই থাকবে।
কয়েক মাস আগে আপনার ফেরার ব্যাপারে বিসিবির উদ্যোগ নেওয়ার খবর এসেছিল। আসলে কী হয়েছিল?
সাকিব: আগের বোর্ড আমাকে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছিল, কিন্তু মুখে বলা আর বাস্তবে করার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। এখনো শুনি সবাই চায় আমি ফিরি, কিন্তু বিড়ম্বনা হলো কেউ আসলে সেই উদ্যোগ নিচ্ছে না (হাসি)।
ক্রিকেটের পরের জীবন নিয়ে কিছু ভেবেছেন?
সাকিব: অনেক অপশন আছে। কোচিং একটি হতে পারে, তবে আমি এখনো মনস্থির করিনি। সত্যি বলতে অবসরের পর ক্রিকেটের সাথেই থাকতে হবে এমন কোনো তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমার নেই। যদি থাকি তবে কোচ বা ম্যাচ রেফারি হওয়া সম্ভব। অন্যথায় ব্যবসা অথবা অবশ্যই রাজনীতি তো আছেই।
তার মানে রাজনীতিতে পূর্ণকালীন সময় দেওয়ার ইচ্ছা আছে?
সাকিব: আমি যেহেতু ইতিমধ্যে রাজনীতির সাথে যুক্ত আছি, তাই এখন হাতে বেশি সময় থাকায় আমি এটিকে ফুল-টাইম অপশন হিসেবে অনুসরণ করতে চাই
আপনি কি ভবিষ্যতে ক্রিকেট প্রশাসকের কোনো ভূমিকায় নিজেকে দেখেন?
সাকিব: আসলে তা নয়। আমি আগেও যেমনটা বলেছি, অবসরের পর ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকার ইচ্ছা আমার নেই—আমি সব সময়ই এমনটা ভেবে এসেছি। অবশ্যই, কয়েক বছর পর কী হবে তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়, তবে এখন পর্যন্ত ক্রিকেট প্রশাসনে আসার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।
ভবিষ্যৎ কী দেখছেন?
সাকিব: আমি এখনো বিষয়টি নিয়ে খুব একটা বিস্তারিত ভাবিনি, তবে আমি আশাবাদী যে বছরের শেষ নাগাদ সবকিছুর একটা সমাধান হবে। আপাতত, আমি শুধু ভালো কিছুর অপেক্ষায় আছি। একটা বিষয় নিশ্চিত—আমাকে বাংলাদেশে ফিরতেই হবে। একমাত্র প্রশ্ন হলো সেটা কত দ্রুত সম্ভব হবে। তবে আমি আশাবাদী যে বছরের শেষ নাগাদ আমি ফিরতে পারব। ঠিক কীভাবে সেটা হবে আমি জানি না, তবে আমি সত্যিই অনেক আশাবাদী।