শুধু রাজধানী ঢাকাকে গুরুত্ব দিয়ে, কোনো পরিকল্পনার সুষ্ঠু প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন অসম্ভব। দেশব্যাপী হকারের সংখ্যা কত? সম্ভবত সরকারি হিসাব নেই। জানা যাচ্ছে, শুধু রাজধানীতেই এই হকার সংখ্যা ৩ লাখের বেশি। দেশব্যাপী হকারের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও, বিভিন্ন তথ্যসূত্র ও জরিপ অনুযায়ী এই সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখের মতো। এতদিন ঢাকার হকাররা ছিলেন সরকারের নজরের বাইরে। এলাকার মাস্তান, স্থানীয় নেতা এবং পুলিশের দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীকে ম্যানেজ করে, তারা ‘হপ্তা’ (চাঁদা) দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু এবার ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে হকারদের ডিজিটাল আইডি কার্ড প্রদান এবং পুনর্বাসনের আওতায় আনার কাজ শুরু হয়েছে। যেহেতু হকাররা সাধারণত অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের কেন্দ্রীয় তালিকা নেই, তাই দেশের ৬৪টি জেলায় সর্বমোট হকারের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। ১৯৫৯ সালের হাট ও বাজার অর্ডিন্যান্স, যা ২০২৩ সালে সংশোধিত হয়ে হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন হয়। সরকারি হাটবাজারগুলোর ব্যবস্থাপনা, ইজারা পদ্ধতি ও আয় বণ্টন নীতিমালা, ২০১১-এর অধীনে দেশব্যাপী ১০,২৭৩টি হাট ও বাজার তালিকাভুক্ত রয়েছে। এই খাত থেকে সরকার বছরে আনুমানিক ১,২৫০ কোটি টাকার রাজস্ব পায়, যার প্রায় ৪৫ শতাংশ স্থানীয় উন্নয়ন, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট হাটবাজারের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হয়।
হকারদের থেকে প্রভাবশালী মহলের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার এটি বন্ধে কিউআর কোডভিত্তিক আইডি কার্ড চালু হচ্ছে। তবে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মতো হকার সেন্টার বা নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণের মাধ্যমে সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব। যে কারণে সরকার, পথচারী চলাচল নির্বিঘœ রেখে হকারদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার কাজ করছে। গত ২৫ এপ্রিল রাজধানীর সড়ক থেকে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের দ্রুত পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হকারদের জন্য দ্রুত বিকল্প স্থান ঠিক করার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘উচ্ছেদ হওয়া হকারদের এমন জায়গায় পুনর্বাসন করতে হবে, যেখানে তারা স্বচ্ছন্দে ও উৎসাহের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবেন।’ এরপর গত ৩০ এপ্রিল ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার মধ্য দিয়ে, হকার পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। করপোরেশন বলছে, প্রস্তাবিত ঢাকা শহরের হকার পুনর্বাসন নীতিমালা, ২০২৬-এর আওতায় নিবন্ধনের মাধ্যমে হকার পুনর্বাসন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে হকারদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ও সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে হকারদের কাউকে চাঁদা দিতে হবে না। তবে সিটি করপোরেশনকে ফি দিতে হবে।
গত ৩০ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন ‘আজ হকারদের কার্ড দেওয়া শুরু হলো। এখন থেকে পর্যায়ক্রমে সব এলাকার হকারদের নিবন্ধনের আওতায় এনে কার্ড দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘কার্ড ছাড়া কোনো ধরনের ব্যবসা করা যাবে না। এমনকি যারা ফুচকার দোকান দেন, তাদেরও নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে।’ ব্যবসার জন্য হকারদের পৃথক বা বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করে দেওয়ার উদ্যোগ এক কথায় চমৎকার। তবে এর সফলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিভিন্ন দেশে হকারদের জন্য হলিডে মার্কেট আছে। নির্দিষ্ট দিনে শহরে নির্বাচিত এলাকায় বিকেলে ও রাতে মার্কেট বসার চলও আছে বিভিন্ন দেশে। আমরাও এভাবে হকারদের পাশে দাঁড়াতে পারি। সে ক্ষেত্রে অন্তরিকতা, নিয়ম-নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। সরকার নির্ধারিত স্থানের বাইরে যাতে তারা না বসতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিভাগীয় শহরেও এই নিয়ম চালু করা দরকার। মোদ্দা কথা, হকারদের বাঁচাতে হবে। একজন হকারের সঙ্গে পরিবারের সদস্যও রয়েছেন। এই সব অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করে, দেশব্যাপী সুষ্ঠু নিয়মের মধ্যে হকারদের নিয়ে আসতে পারলে, এই উদ্যোগ দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে।