আইনের লোকের বেআইনি কাজ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৩ এএম

একজন ফল বিক্রেতার দোকান। টেবিলের ওপর রাখা একটি স্মার্টফোন। দোকানে ঢুকলেন পুলিশের একজন উপপরিদর্শক। ফল কিনলেন, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন, তারপর বেরিয়ে গেলেন। পরে দোকানি আবিষ্কার করলেন তার ফোনটি নেই। সিসিটিভি ফুটেজ ঘিরে অভিযোগ উঠল, পুলিশের ওই কর্মকর্তাই ফোনটি সঙ্গে নিয়ে গেছেন। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তাকে হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে। আজমিরীগঞ্জের ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে। এর গভীরে তাকালে সামনে আসে আরও অস্বস্তিকর এক বাস্তবতা। যার পেশাগত দায়িত্ব মানুষের সম্পদ ও নিরাপত্তা রক্ষা করা, তার বিরুদ্ধেই যখন অন্যের সম্পদ হরণ করার অভিযোগ ওঠে, তখন ক্ষতিটা একটি ফোনের দামের মধ্যে আটকে থাকে না। আঘাত লাগে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থায়। সংবাদে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, আজমিরীগঞ্জ বাজারের ফল ব্যবসায়ী রাজিব আহমেদের দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে এসআই রাসেল মিয়ার গতিবিধি ধরা পড়েছে। ব্যবসায়ীর দাবি, ফোন ফেরত চাইলে প্রথমে নেওয়ার কথা অস্বীকার করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজের প্রসঙ্গ আসার পর গভীর রাতে মোবাইলটি ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে তাকে ১৫ হাজার টাকা দেন। আজমিরীগঞ্জ থানার ওসিও ফুটেজ দেখার কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুসারে, ঘটনাটি পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানানোর পর সংশ্লিষ্ট এসআইকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে।

অভিযোগটির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও থাকতে হবে। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা যাদের হাতে দেওয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু ক্লোজ করার মধ্য দিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি হলে জনমনে আরও গভীর সংশয় তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি সম্পদের অপচয় এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়ম নিয়ে বহু দিন ধরে আলোচনা চলছে। তবে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একই কাতারে ফেলা অন্যায্য। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ কাজ করছেন। তাদের কাজের কারণেই বহু প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন সচল থাকে। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন অনিয়মকারী ব্যক্তি নিশ্চিত হয়ে যান যে, তার কাজের জন্য বড় কোনো মূল্য দিতে হবে না। দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি নয়। এর চেয়েও বড় ক্ষতি ঘটে মানুষের বিশ্বাসে। একজন নাগরিক যখন মনে করেন ঘুষ ছাড়া সেবা, প্রভাব ছাড়া ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন এবং ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য নিয়ম আলাদা, আইন তখন নাগরিকের কাছে সমান অধিকারের আশ্রয় হিসেবে গুরুত্ব হারায়। পুলিশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। একজন মানুষ বিপদে পড়লে প্রথম যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে যান, পুলিশ স্টেশন তার মধ্যে অন্যতম। চুরি, হামলা কিংবা নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ পুলিশের কাছেই সহায়তা চান। সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি চুরির অভিযোগ ওঠে, তখন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যার কাছে প্রতিকার চাইব, তার কাছেই যদি নিরাপদ না থাকি, তবে যাব কোথায়?

এখানেই ব্যক্তিগত অপরাধ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো প্রতিষ্ঠানের একজন সদস্যের অপরাধ পুরো প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী করে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠান সেই সদস্যের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই জনসাধারণের আস্থা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। অভিযোগ চাপা দেওয়া, দায় লঘু করা, বিভাগীয় বদলি কিংবা ক্লোজ করেই বিষয় শেষ করার সংস্কৃতি দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করে। বিপরীতে দ্রুত তদন্ত, তথ্য প্রকাশ, যথাযথ আইনি ব্যবস্থা এবং অভিযোগকারী নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অনিয়ম বিস্তারের পেছনে আরেকটি বড় কারণ দায়মুক্তির সংস্কৃতি। ছোট অনিয়ম উপেক্ষা করতে করতে একসময় বড় অনিয়মও স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঘুষকে ‘খরচ’, ক্ষমতার অপব্যবহারকে ‘সুবিধা’ আর অনিয়মকে ‘ম্যানেজ’ করার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা সমাজের জন্য গভীর বিপদের। তখন দুর্নীতি কেবল কিছু ব্যক্তির আচরণে সীমিত থাকে না, ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। এ অবস্থা থেকে বের হতে শুধু ব্যক্তির সততার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর জবাবদিহি, স্বাধীন তদন্ত, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, সম্পদের হিসাবের কার্যকর নজরদারি এবং অপরাধের ক্ষেত্রে পদমর্যাদা নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের ক্ষেত্রেও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিক অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আজমিরীগঞ্জের একটি ফলের দোকানের মোবাইল ফোন তাই আমাদের সামনে অনেক বড় উদ্বেগ এনে দিয়েছে। রাষ্ট্র কেবল আইন, দপ্তর, পোশাক আর পদবির সমষ্টি দিয়ে শক্তিশালী হয় না। তার শক্তি তৈরি হয় মানুষের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং ক্ষমতার সৎ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। সেই জায়গাগুলো ক্ষয়ে গেলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যত আকর্ষণীয় হোক, রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণেই আজমিরীগঞ্জের অভিযোগটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ফেলে রাখার সুযোগ নেই। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছড়িয়ে থাকা ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা দরকার। কারণ রক্ষকের ওপর মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার আস্থার সম্পর্কটিও ভেঙে পড়ে।

লেখক : কবি, অধিকার কর্মী ও কলাম লেখক।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত