১৭ আগস্ট বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ছয় মাস পূর্ণ করতে চলেছে। যাত্রার শুরুতেই দায়িত্বশীলরা অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে সরকার অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে এক্ষেত্রে অগ্রগতি কতটা কী। ১২ আগস্ট দেশ রূপান্তরের ছাপা ও অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত আইনশৃঙ্খলার অবনতিজনিত প্রতিবেদনগুলো সংগত কারণেই প্রশ্নের পরিসর আরও বাড়িয়েছে। ওই দিন সাভারের সাধাপুর এলাকায় মসজিদের মাঠে প্রেশারকুকারে রাখা বোমার বার্তাটিও আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে জনরায়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামনে রেখে দায়িত্ব গ্রহণ করে। আমরা জানি, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলজুড়ে জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার চিত্র প্রীতিকর ছিল না। কাক্সিক্ষত আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছায়া ছিল বিস্তৃত। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা নিয়ে বর্তমান সরকার এর উন্নয়নে চ্যালেঞ্জে এখন পর্যন্ত জনপ্রত্যাশা অনুসারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে পারেনি এ অভিযোগ নানা মহল থেকে উঠেছে। আমরা জানি, এ ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতায় ঘাটতি নেই। কিন্তু এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো কেন দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করতে পারছে না, জনপরিসরে এই জিজ্ঞাসা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি পরিমাপের মূল সূচকগুলো হলো অপরাধের মাত্রা হ্রাস, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর টহল, জনমনে নিরাপত্তা বোধ এবং রাজনৈতিক-সামাজিক সহিংসতা বা দুষ্কর্মের হার কমে আসা ইত্যাদি। এই সূচক সমাজের শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঠিক চিত্র তুলে ধরে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এ সরকারের ঘোষিত তিন অগ্রাধিকারের একটি। তবে অবৈধ অস্ত্র, জামিনে বের হওয়া পেশাদার সন্ত্রাসীদের তৎপরতা, চাঁদাবাজি, মাদক ও উগ্রবাদী তৎপরতার শঙ্কা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান। নিকট অতীতে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ শুধু অপরাধ দমনের বিষয় নয়, এটি তর্কাতীতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জনআস্থার প্রশ্ন। দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত অগ্রগতি দেখানো জরুরি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে ছিলেন এবং এক্ষেত্রে আগের চেয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো ‘কিন্তু’ মুক্ত নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর অনেক পেশাদার সন্ত্রাসীর জামিনে মুক্ত হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছিল। গত ৯ আগস্ট একটি দৈনিকের সচিত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘চট্টগ্রামে থানা-ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করছে অপরাধীরা। দুই বছর আগে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ১৪৮টির হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর প্রকাশ্যে গুলি চালানো ২৫ অস্ত্রধারীও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।’ বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ইতিপূর্বে অভিযান চালিয়েছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী, কিন্তু তারপরও লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্রের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
যেকোনো স্থিতিশীল সমাজের অন্যতম শর্ত জননিরাপত্তা। টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও জননিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। সন্দেহ নেই, অপরাধ সমাজের অন্যতম ব্যাধি এবং এ ব্যাধি মানুষের স্বস্তি কেড়ে নেয় ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়। আমাদের বিশ্বাস, আইনের শাসন নিশ্চিত হলে অনেক অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। নিকট অতীতে কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসীর মুক্তি দেওয়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল, এদের কারণে জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। আমরা মনে করি, এই বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখার পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিশ্চয়তা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সব ধরনের অপরাধ নিরসনে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতি চিরুনি অভিযানের ফের তাগিদ দিচ্ছে বলেও আমরা মনে করি। কিন্তু অভিযানে কোনো নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সতর্ক নজর রাখতে হবে সেদিকেও। যুক্তরাষ্ট্রের ২৬তম রাষ্ট্রপতি থিওডর রুজভেল্ট যথার্থই বলেছেন, ‘আইনের ওপরে কেউ নেই, আইনের নিচেও কেউ নেই।’