ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পাল্টা অবরোধে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ-রুট দিয়ে বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। সেই প্রচেষ্টার মধ্যেই ইরানের জন্য ছয়টি স্থল ট্রানজিট রুট চালু করেছে পাকিস্তান। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একটি আনুষ্ঠানিক সড়ক করিডর গড়ে উঠল।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৫ এপ্রিল ‘ট্রানজিট অব গুডস থ্রু টেরিটরি অব পাকিস্তান অর্ডার ২০২৬’ জারি করে, যা সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়। এই আদেশ অনুযায়ী, তৃতীয় দেশের পণ্য পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে সড়কপথে ইরানে পাঠানো যাবে; তবে পাকিস্তানের নতুন এই ট্রানজিট সুবিধা ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত পাকিস্তান বিমানযুদ্ধের পর জারি করা একটি আদেশ অনুযায়ী, ভারতের কোনো পণ্য পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে পরিবহন নিষিদ্ধ এবং সেই সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বর্তমানে ইরানে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সব স্থলপথই কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দর ও হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে করাচি বন্দরে ৩ হাজারের বেশি কনটেইনার আটকা পড়ে থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান এই উদ্যোগকে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। এই ছয়টি রুট পাকিস্তানের প্রধান বন্দরগুলো- করাচি, পোর্ট কাসিম ও গোয়াদরকে ইরানের গাবদ ও তাফতান সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই রুটগুলো
বেলুচিস্তানের তুরবত, পাঞ্জগুর, খুজদার, কোয়েটা ও দালবান্দিনের মধ্য দিয়ে গেছে। সবচেয়ে ছোট রুট গোয়াদার গাবদ করিডর, যা ভ্রমণ সময় কমিয়ে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে পারে। তুলনায় করাচি থেকে ইরান সীমান্তে পৌঁছাতে সময় লাগে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই রুট ব্যবহার করলে পরিবহন খরচ ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
এই করিডর শুধু বাণিজ্য নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক অবনতি হওয়ায় এই নতুন পথের গুরুত্ব বেড়েছে। টর্কহাম ও চামান সীমান্ত এখন আর নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য পথ নয়, ফলে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের স্থল যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষক ইফতিখার ফিরদৌস বলেন, এটি একটি ‘মৌলিক পরিবর্তন’; যার ফলে পাকিস্তান এখন আফগানিস্তানকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি পশ্চিমমুখী বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, এই করিডর পাকিস্তানের ওপর দীর্ঘ সমুদ্রপথের নির্ভরতা কমাবে এবং চীন-সমর্থিত বাণিজ্য রুটের জন্য পাকিস্তানকে প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে বিশ্লেষক মিনহাস মাজিদ মারওয়াত সতর্ক করে বলেন, এই উদ্যোগ যেমন বড় সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়ে গেছে বিশেষ করে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে। তবে এই করিডর সফল হলে দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্র বদলে যেতে পারে আর তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের এ পদক্ষেপকে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে চাপে রাখার যে চেষ্টা করছে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ কি সেই চেষ্টাকে দুর্বল করে দেবে উঠেছে সেই প্রশ্ন। এ ছাড়া, যুদ্ধ বন্ধে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনাতেই বা এর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিশ্লেষণ। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে আঞ্চলিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের এ সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্য সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান তেহরানকে এই সুবিধা দেওয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে নতুন কোনো টানাপড়েন তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।