বাবর গড়লেন ইতিহাস

মাকালুর চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আট হাজার মিটার (২৬,২৪৭ ফুট) বা তার বেশি উঁচু পর্বতের সংখ্যা পৃথিবীতে মাত্র ১৪টি। এই পর্বতগুলো পরিচিত ‘এইট-থাউজেন্ডার’ নামে এবং এদের সবকটিই অবস্থিত এশিয়ার হিমালয় ও কারাকোরাম রেঞ্জে। সব পর্বতারোহীই স্বপ্ন দেখেন এই শৃঙ্গগুলো জয়ের।

বাংলাদেশের পর্বতারোহী ডা. বাবর আলী সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিচ্ছেন। ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি চারটি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করেছিলেন। কোনো বাংলাদেশি পবর্তারোহী হিসেবে তিনিই ছিলেন এই কৃতিত্বের অধিকারী। এবারে তার ঝুলিতে যোগ হয়েছে নতুন পালক। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে তিনি সফলভাবে আরোহণ করেছেন বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু (৮,৪৮৫ মিটার)।

চীন ও নেপালের মধ্যে অবস্থিত মাকালু একটি বিচ্ছিন্ন চূড়া। ১৯৫৫ সালের ১৫ মে সর্বপ্রথম একদল অভিযাত্রী এর শীর্ষে আরোহণ করেছিল। বাবর আলী আরোহণের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পর্বত হিসেবে বিবেচিত এই পর্বতে প্রথম বাংলাদেশি পর্বতারোহী হিসেবে জয় করলেন।

জানা গেছে, ‘এক্সপিডিশন মাকালু : দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শিরোনামের এ অভিযানের আয়োজন করে ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স। ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান নেপালের আউটফিটার মাকালু অ্যাডভেঞ্চারের স্বত্বাধিকারী মোহন লামসালের সূত্রে বাবর আলীর সাফল্যের তথ্য নিশ্চিত করেন।

শিখর জয়ের সময় বাবর আলীর সঙ্গে ছিলেন অভিজ্ঞ শেরপা আং কামি শেরপা।

জানা যায়, ‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ নামে পরিচিত এই শৃঙ্গ জয়ের লক্ষ্যে বাবর দেশ ছাড়েন গত ৭ এপ্রিল। ৯ এপ্রিল তিনি টুমলিংটার হয়ে সেদুয়া গ্রামে পৌঁছে পায়ে হেঁটে ১৮ এপ্রিল বেসক্যাম্পে যান। উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে ধাপে ধাপে ক্যাম্প ১ ও ক্যাম্প ২-এ অবস্থান করেন।

দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল আবারও অভিযানে উঠে ক্যাম্প ২ পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসেন। পরে অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষা শেষে ৩০ এপ্রিল আবার চূড়ায় ওঠা শুরু করেন। সেদিন ক্যাম্প ২ এবং পর দিন ক্যাম্প ৩-এ উঠে মাঝরাতে শিখরের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

একটানা ১১০০ মিটারের বেশি ভয়ানক চূড়ায় অতিক্রম করে ২ মে ভোরে পৌঁছেন শিখরে। বর্তমানে তিনি ক্যাম্প ২-এ অবস্থান করছেন এবং আজ (৩ মে) তার বেসক্যাম্পে ফেরার কথা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাবর আলীর এই সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ এক অভিযাত্রার ধারাবাহিকতা।

পর্বতারোহণে বাবরের পথচলা শুরু ২০১৪ সালে, আর ট্রেকিং শুরু ২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে। ২০১৭ সালে ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে তিনি প্রশিক্ষণ নেন। ২০২২ সালে আমা দাবলাম, ২০২৪ সালে একই অভিযানে এভারেস্ট ও লোৎসে এবং ২০২৫ সালে অন্নপূর্ণা-১ ও মানাসলু জয় করেন। মানাসলু আরোহণ ছিল কোনো বাংলাদেশির প্রথম অক্সিজেন ছাড়া আট-হাজারি জয়।

মাকালু জয় বাবরের পঞ্চম আট-হাজারি সাফল্য। ১৪টি এইট-থাউজেন্ডার শৃঙ্গ জয় করার স্বপ্নে তিনি এখন আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন।

অভিযান-ব্যবস্থাপক ও ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান জানান, ‘বাবরের এই অভিযাত্রা শুধু ব্যক্তিগত গৌরব নয়; এটি বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসেও নতুন অধ্যায়।’