দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া পাথর খনি। মূলত এ খনির পাথর উৎপাদন হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নদীশাসনের কাজে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু রেলওয়ে ও পাউবো বর্তমানে মধ্যপাড়ার পাথর না কেনায় দিন দিন এখানে পাথরের স্তূপ বাড়ছে। বর্তমানে তা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ, অর্থাৎ ১৫ লাখ টন পাথর ২৫টি ইয়ার্ডে অবিক্রীত পড়ে আছে। ফলে উত্তোলনকৃত পাথর রাখার স্থান সংকটে কিছু দিনের মধ্যে আবার খনিটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
জানা যায়, দেশে বছরে পাথরের চাহিদা প্রায় দুই কোটি ১৬ লাখ টন। মধ্যপাড়া খনিতে পাথর থাকা সত্ত্বেও নদীশাসনসহ অন্যান্য সরকারি উন্নয়নকাজে ব্যবহার হচ্ছে ভারত, ভুটান, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানিকৃত পাথর।
খনির একটি সূত্র জানিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিক্রি না হওয়ায় খনি ইয়ার্ডে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বিভিন্ন আকারের প্রায় ১৫ লাখ টন পাথর পড়ে আছে। উত্তোলন বাড়লেও পাথর বিক্রিতে কোনো গতি আসছে না। মধ্যপাড়ায় বর্তমানে অবিক্রীত পাথরের স্তূপ ক্রমেই বাড়ছে। খনি থেকে প্রতিদিন পাথর উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৫ হাজার টন। খনির ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে দৈনিক ছয় হাজারের অধিক টন পাথর উত্তোলন করছে, বিপরীতে বিক্রি হচ্ছে প্রায় দুই হাজার টন। বাজার উপযোগী বিপণনব্যবস্থা না থাকায় পাথর বিক্রিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় পাথর বিক্রির পরিমাণ না বাড়ায় কোম্পানিটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি মাসে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
এর আগে ২০১৫ সালের জুন মাসে খনি কর্তৃপক্ষের অদক্ষ বিপণনব্যবস্থার কারণে খনির ৯টি ইয়ার্ডে প্রায় সাত লাখ টন পাথর অবিক্রীত ছিল। ফলে পাথর রাখার স্থান সংকটে ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত পাথর উত্তোলন ও খনি উন্নয়নকাজ বন্ধ রাখতে হয়। এ অবস্থায় খনির ওপর নির্ভরশীল শ্রমিক ও খনিসংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর জীবন ও জীবিকা নির্বাহে অপূরণীয় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, খনিতে প্রত্যক্ষভাবে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী, পরিবহন, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও কয়েক হাজার মানুষ। উত্তোলন বন্ধ হলে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। শুধু শ্রমিক নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মধ্যপাড়া খনি থেকে পাথর উত্তোলন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি। উত্তোলিত পাথর বিক্রির দায়িত্বে রয়েছে পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল)। এই খনির পাথর সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয় না। তাদের নির্ধারিত ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে ১৬৫ ডিলারের মধ্যে ৪০-৪৫ জন খনির পাথর নিচ্ছেন। অন্যদিকে ধারদেনা করে খনির ঠিকাদারের বিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে। খনির একটি বিশ^স্ত সূত্র জানিয়েছে, খনি কর্তৃপক্ষের বাস্তবসম্মত বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় পাথর বিক্রিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিক্রয়নীতি বাজার উপযোগী না হওয়ায় প্রতি মাসে ১৫ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির খনির নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক ডিলার জানান, পাথর বিক্রি না হওয়ার মূল কারণ হলো বিপণনব্যবস্থায় ত্রুটি। এ কারণেই পাথর বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। খনিতে গ্রাহকরা চাহিদা অনুযায়ী পাথরের সাইজ পাচ্ছে না। হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানিকৃত পাথর সাইজ অনুযায়ী পাওয়া যায়। মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি না হওয়ার মূল কারণ হলো সামগ্রিকভাবে লাভ কমে যাওয়ায় এই পাথর বিক্রিতে আমাদের আগ্রহ কমে গেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ভারত, ভুটানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাথর আমদানি করছে।
এমজিএমসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও সেবা) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে খনিতে ছয় সাইজের পাথর উৎপাদন হচ্ছে। সেই সঙ্গে দেশের মেগাপ্রকল্পসহ অনেক নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় পাথর বিক্রি কমেছে।
খনির ডিলার মেসার্স মমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মমিনুল হক বলেন, আমদানি করা পাথরের (কালো) চেয়ে মধ্যপাড়ার পাথর কয়েক গুণ ভালো। আগে ৩ শতাংশ কমিশন দেওয়া হতো, এখন তা বন্ধ আছে। এখন সাইজ অনুযায়ী পাথর পাওয়া যাচ্ছে।
মধ্যপাড়া পাথর খনির (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) সূত্র জানায়, কোন কোন দিন দুই হাজার টন পর্যন্ত পাথর বিক্রি হয়। আবার কোনো দিন একেবারেই বিক্রি হয় না।
মধ্যপাড়া লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদেকুল ইসলাম জানান, ইতিপূর্বে এই খনিতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক পাথর বিক্রি হতো, বর্তমানে তা কমে ৭০ থেকে ৮০টিতে নেমে এসেছে। খনিতে পাথর লোডিংয়ে প্রায় ৮০-৮৪ শ্রমিক আছেন। কাজ কমে যাওয়ায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খনি কর্তৃপক্ষ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পাথর বিক্রি করতে না পারলে সব দিকে বিপর্যয় আসবে।
এ বিষয়ে এমজিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডিএম জোবায়েদ হোসেন দৈনিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, উৎপাদন ভালো হলেও বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না। বাংলাদেশ রেলওয়ে ও নদীশাসনের জন্য এই খনির পাথর উৎপাদন হয়। কিন্তু তারা গ্রহণ করছে না। এ বিষয়ে একাধিক চিঠি চালাচালি করেছি। কোনো কাজ হচ্ছে না। রেলওয়ে, নদীশাসন কাজসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে যদি খনির পাথর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। তাহলে দেশের একমাত্র খনিটি প্রাণ ফিরে পাবে। রেলওয়ে, নদীশাসন কাজে পাথর ক্রয় না করায় ইয়ার্ড পূর্ণ এবং বিদেশ থেকে নিয়ে আসা ডেটোনেটরের (বিস্ফোরক) ওপর রয়্যালটি না কমানোয় পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা। এ ছাড়া পাথর পরিবহনে মধ্যপাড়া খনি থেকে পার্বতীপুরের ভবানীপুর স্টেশন পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার রেলপথটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। এটি সংস্কার করে চালু করলে পাথর পরিবহন খরচ অনেক কমে আসবে।