‘বড়কুঠি’ ফিরে পেতে চায় রাবি

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পদ্মাপাড়ের ঐতিহাসিক স্থাপনা বড়কুঠি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্নে এটিই ছিল প্রথম প্রশাসনিক ভবন ও উপাচার্যের কার্যালয়। পরে দীর্ঘ সময় ধরে রাবির প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন আর রাবির অধীনে নেই। পুরাকীর্তি হিসেবে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্থাপনাটি আবারও রাবির অধীনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে, সাহেববাজার ও রাজশাহী কলেজের দক্ষিণে ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই বড়কুঠি। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৮১৪ সালে ডাচরা ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তি করে বড়কুঠিসহ ভারতের সব ব্যবসা কেন্দ্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হস্তান্তর করে। কোম্পানি ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত ভবনটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। পরে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তান সরকার বড়কুঠি ও এর সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের আগপর্যন্ত এটি ছিল ভাইস চ্যান্সেলরের (উপাচার্য) বাসভবন ও কার্যালয়। নিচতলা ছিল অফিস, উপরতলা বাসভবন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় নতুন স্থাপনায় স্থানান্তরিত হওয়ায়, বড়কুঠির নিচতলা সহকারী কর্মচারী ইউনিয়নের অফিস এবং উপরতলা টিচার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

ইট নির্মিত, সমতল ছাদবিশিষ্ট এই দ্বিতল ইমারতটি আঠারো শতকের ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্টভাবে ধারণ করে। এটি দৈর্ঘ্য ২৪ মিটার, প্রস্থ ১৭.৩৭ মিটার এবং মোট ১২টি কক্ষে বিভক্ত। কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় সভাকক্ষ, যা পূর্ব-পশ্চিমে ৯.৬০ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ৬.৩০ মিটার আয়তনবিশিষ্ট। সভাকক্ষের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে বারান্দা, পশ্চিম দিকে দুটি এবং পূর্ব দিকে তিনটি কক্ষ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বড়কুঠি সম্পর্কে বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকেরই তেমন ধারণা নেই। কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা জানেন না এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিই এক সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রশাসনিক ভবন ও উপাচার্যের কার্যালয় ছিল। বিষয়টি নিয়ে কথা বললে শিক্ষার্থীরা ইতিহাস সংরক্ষণ ও এ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রাবির ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্সে বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাইমিন বলেন, ‘বড়কুঠি শব্দটি আমি আমার ক্যাম্পাস জীবনের ৩ বছরের মধ্যে প্রথম শুনলাম। অবশ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত ছিল যেহেতু এটা আমাদেরই অংশ ছিল, তাই এ বিষয়টি সম্পর্কে হাইলাইট করা এবং এটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই রাখা। অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা বড়কুঠি সম্পর্কে অবগত নন।’

রাবির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বড়কুঠি সম্পর্কে আগে তেমন কিছু জানতাম না। এটি যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রশাসনিক ভবন ছিল, সেটাও এই প্রথম জানতে পারলাম। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ইতিহাসের এমন একটি বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানানো।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন জানান, বড়কুঠি সম্পর্কে বাংলাদেশে তেমন কোনো ঐতিহাসিক দলিলপত্র পাওয়া না গেলেও নেদারল্যান্ডসের আর্কাইভে ডাচ ভাষায় এটি সংরক্ষিত আছে। তিনি বলেন, ‘বড়কুঠি ছিল ইউরোপীয় বণিকদের নির্মিত। ১৭ থেকে ১৮ শতকে ওলন্দাজরা এটি নির্মাণ করে, যেটি একটি বাণিজ্যিক গুদামঘর বা কুঠি হিসেবে পরিচিত ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ড. ইতরাত হোসেন জুবেরি রাবির প্রথম উপাচার্য হিসেবে বড়কুঠিকে প্রশাসনিক ভবন হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ১৯৫৮-৬৪ সালের সময়কালে প্রশাসনিক কার্যক্রম মতিহার চত্বরে স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকে প্রায় ২০২০ সাল পর্যন্ত বড়কুঠি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তারপর থেকে বড়কুঠির নিয়ন্ত্রণ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের হাতে চলে যায়। এটিকে সিটি করপোরেশনের হেরিটেজ বা আর্কাইভ করার চেষ্টাও করা হয়েছিল তবে কোনো কারণে এখনো সম্ভব হয়নি।

বড়কুঠি সম্পর্কে কথা হয় পুঠিয়া রাজবাড়ী জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চলের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা বড়কুঠিকে ২০১৮ সালে সরকার পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে ভবনটি সরকারের হেফাজতে রয়েছে এবং আংশিক সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। ভবিষ্যতে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অতিরিক্ত সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর দ্রুত এই উন্নয়নকাজ শুরু করে বড়কুঠিকে বরেন্দ্র জাদুঘরের মতোই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

বড়কুঠি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আর্কিওলজিক্যাল অ্যাক্ট ১৯৬৮ (সংশোধিত-১৯৭৬)-এর সংশ্লিষ্ট ধারার আলোকে সরকার দেশের সব প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনার সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করে; এবং এই আইন অনুযায়ীই বড়কুঠিকে পুরাকীর্তি ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।’

বড়কুঠিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘বড়কুঠি প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে চলে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় এর বিরোধিতা করছে। এটি ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেছি এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে ভূমিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। ভূমি মন্ত্রণালয় যাতে এটি আমাদের ফিরিয়ে দেয়, সে জন্য আমরা অফিসিয়াল চিঠি প্রেরণের উদ্যোগ নিচ্ছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত