জার্মানি থেকে ৫ হাজার সৈন্য সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ‘পূর্বাভাসযোগ্য’ বা আগে থেকেই আন্দাজ করা গিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস। তবে এই ঘোষণার পর সামরিক জোট ন্যাটো জানিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনের কাছে এই সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।

শনিবার (২ মে) সংবাদ সংস্থা ডিডিপিএ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, ‘ইউরোপে এবং বিশেষ করে জার্মানিতে মার্কিন সৈন্যদের উপস্থিতি আমাদের স্বার্থের পাশাপাশি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্যও জরুরি।’ 

এদিকে, ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট জানিয়েছেন, মার্কিন সিদ্ধান্তের খুঁটিনাটি বুঝতে জোট বর্তমানে ওয়াশিংটনের সাথে কাজ করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জের মধ্যে সাম্প্রতিক বাকযুদ্ধের পরই ওয়াশিংটন এই পদক্ষেপ নিল। গত সোমবার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে মার্জ মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের আলোচনায় মার্কিনীরা ‘অপমানিত’ হচ্ছে। তার মতে, মার্কিনীরা কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই ইসলামাবাদে যাতায়াত করছে কিন্তু কোনো ফলাফল পাচ্ছে না। পুরো জাতিই ইরানের কাছে হেয় হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেন, মার্জ সম্ভবত মনে করেন ইরানের পরমাণু অস্ত্র থাকা ঠিক আছে এবং তিনি আসলে কী বলছেন তা তিনি নিজেই জানেন না। এর পরপরই সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। পেন্টাগন মুখপাত্র শন পার্নেল জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই নির্দেশ দিয়েছেন এবং আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

বর্তমানে জার্মানিতে ৩৬ হাজারের বেশি সক্রিয় মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা ইউরোপের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর তুলনায় ইতালিতে ১২ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার সেনা রয়েছে। শনিবার রাতে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা সেনাসংখ্যা অনেক কমিয়ে আনব এবং এটি ৫,০০০-এর চেয়েও অনেক বেশি হবে।’ তিনি ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে ৩২ সদস্যের ন্যাটো জোটের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্প্রদায়ের জন্য বাহ্যিক শত্রুর চেয়েও বড় হুমকি হলো আমাদের জোটের চলমান ভাঙ্গন। এই বিপর্যয়কর প্রবণতা রুখতে আমাদের সব কিছু করতে হবে।’

ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকান পার্টির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতারাও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। সিনেট ও হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান যথাক্রমে সিনেটর রজার উইকার এবং রিপ্রেজেন্টেটিভ মাইক রজার্স এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইউরোপ থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার বদলে সেখানে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখা মার্কিন স্বার্থের জন্য অনুকূল।’

পিস্টোরিয়াস জানিয়েছেন, ইউরোপকে এখন নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। জার্মানি ইতিমধ্যে সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ২০২৭ সাল নাগাদ বার্লিন প্রতিরক্ষা খাতে ১০৫.৮ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন মোকাবিলায় সহায়তাসহ জার্মানির মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় বর্তমানে জিডিপির ৩.১ শতাংশে পৌঁছাতে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত বছর দ্য হেগ-এ অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে মিত্র দেশগুলো তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট বলেন, মার্কিন এই সিদ্ধান্ত ইউরোপকে নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোর সমালোচক ট্রাম্প মূলত হরমুজ প্রণালীতে সামরিক অভিযানে মিত্রদের অংশ না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান ওই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথে যাতায়াত সীমিত করে দিয়েছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে। মিত্ররা এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সরাসরি অংশ না নেওয়াতেই ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি