আর ফিরল না ফুলঝুরি

নাইকন ফ্যান ক্লাবের উদ্যোগে ‘অভিযাত্রিক সুন্দরবন’ ব্যানারে বাদাবনের পাখি-প্রাণী পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর বিকেলে ঢাকা থেকে খুলনার পথে রওনা হলাম। রাতে খুলনায় পৌঁছে ফেমাস ট্যুর বিডির ‘দি বেঙ্গল অ্যাডভেঞ্চার’ লঞ্চে চললাম কচিখালীর উদ্দেশে। দুদিন ধরে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক, কচিখালী, ডিমের চর, কটকা ও জামতলী সমুদ্রসৈকত ঘুরে বহু পাখি-প্রাণীর ছবি তুলে শেষের দিন, ৩ নভেম্বর করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে পৌঁছলাম। সুন্দরবনের অন্যান্য স্পট থেকে এখানে যেমন মানুষের চাপ অনেক বেশি, তেমনি পাখির প্রাচুর্যতাও বেশি। এখানকার স্বল্প পরিসরে কাঠের ট্রেকে হেঁটে পাখি দেখা নিয়ে কখনো হতাশ হতে হয়নি।

সকাল সাড়ে ৭টায় লঞ্চ থেকে নেমেই পাখি পর্যবেক্ষণ ও ছবি তোলায় মনোযোগী হলাম। এক ঘণ্টা ১৫ মিনিটে ১২ প্রজাতির পাখির ছবি তুললাম। এরপর পরিচিত একটি জায়গায় এসে অতি ক্ষুদ্র এক পাখিকে খুঁজতে লাগলাম। আশ্চর্যের বিষয়, মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যে পাখিটি এসে হাজির হলো এবং মনের সুখে গান গাইতে লাগল। মাত্র ৬ সেকেন্ডে ৬টি ছবি উপহার দিয়ে পাখিটি উড়ে গেল। আর ফিরে এলো না।

আঠারো বছর আগে পাখিটিকে প্রথম দেখি মালয়েশিয়ার বাটারওর্থে অবস্থিত পেনাং বার্ড পার্কে। একটি চিমা কলার (এক ধরনের শোভাবর্ধনকারী কলাগাছ) মোচায় বসে কলা ফুল থেকে মহানন্দে নির্যাস পান করছিল। সেই থেকে ওকে আমি খুঁজছি এদেশে, বিশেষ করে সুন্দরবনে। এগারো বছর পর ২০১৯ সালের জুলাইয়ের

তৃতীয় সপ্তাহে এই জায়গাতেই প্রথম আমি ওকে খুঁজে পাই। তখন ও আমাদের প্রচুর সময় দিয়েছিল। কিন্তু সুন্দরবনে দ্বিতীয়বারের মতো ওর দেখা পেতে আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হলো। সুন্দরবনের দুর্লভ ও ক্ষুদ্র এই পাখিটি আর কেউ নয়, এদেশের সবচেয়ে ছোট পাখির গোত্র ফুলঝুরির সদস্য কমলাপেট বা কমলা-নীল ফুলঝুরি। আকার

বিবেচনায় এটি এদেশের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম পাখি। অবশ্য এদেশে ৯ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যরে আরও ৬-৭টি পাখির অস্তিত্ব রয়েছে। পাখিটির ইংরেজি নাম Orange-bellied Flowerpecker। মালয়েশিয়ায় যে পাখিটি দেখেছিলাম সেটির প্রজাতি এক হলেও উপপ্রজাতি ছিল আলাদা। ডাইসিডি (Dicaeidae) গোত্রের ক্ষুদ্র পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম উDicaeum trigonostigma 

 (ডাইসিয়াম ট্রাইগোনস্টিগমা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে বাস করে।

কমলাপেট ফুলঝুরির দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ৮-৯ সেন্টিমিটার ও ওজন ৫.০-৮.৭ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মাথা, ডানা ও লেজ গাঢ় কালচে-ধূসর। গলা ও বুক ফ্যাকাশে-ধূসর। পিঠ, কোমর, পেট ও পায়ু লালচে-কমলা। পুরু কালো চঞ্চুটি নিচের দিকে কিছুটা বাঁকানো। চোখ বাদামি। অন্যদিকে স্ত্রীর দেহের ওপরটা ধূসরাভ-জলপাই এবং কোমর ফ্যাকাশে কমলা। গলা ও বুক ফ্যাকাশে ধূসরাভ-জলপাই। হলদে-কমলা পেট ও পায়ু। চোখ ধূসর ও ঠোঁট লালচে-বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে পা ও পায়ের পাতা কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহ অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল, পিঠ জলপাই-বাদামি, কোমর, পেট ও লেজতল ঢাকনি জলপাই-হলুদ ও কালো আগাসহ ঠোঁট হালকা রঙের।

এরা লোনাজলের সুন্দরবন এবং চট্টগ্রাম বিভাগের (বিশেষত টেকনাফ) মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। দিবাচর পাখিগুলো উঁচু গাছের ওপর জন্মানো পরজীবী উদ্ভিদে বাস করে ও খাবার খোঁজে। ফল, ফুলের নির্যাস, পরগাছার পাতা ও পোকামাকড় খায়। পানির জন্য কখনো মাটিতে নামে না; পাতায় জমে থাকা পানি পান করে। পরগাছার ঝোপে লুকিয়ে থাকে বলে সচরাচর চোখে পড়ে না। কর্কশ ধাতব কণ্ঠে ‘জিট...’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে মে প্রজননকাল। এ সময় উঁচু পত্রবহুল গাছের পরগাছার নিচের দিকে ঘাস, শেওলা ইত্যাদি মাকড়সার জালে জড়িয়ে নাশপাতি আকারের ছোট বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ২-৩টি। সাদা রঙের এই ডিমগুলোয় গাঢ় রঙের ফোঁটা থাকে। প্রায় দুই সপ্তাহ তা দেওয়ার পর ডিম ফোটে। ছানাদের উড়তে শিখতে আরও দুই সপ্তাহ লাগে। বাসা বানানো ও ছানাদের খাওয়ানোর কাজ মা-বাবা মিলেমিশে করে। আয়ুষ্কাল মাত্র ২-৩ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়