অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বাঁধ ভেঙে তৈরি হওয়া হঠাৎ বন্যার কারণে হাওরজুড়ে কৃষক সংকটে। হাজার হাজার কৃষক কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য বলছে, ৭টি জেলার হাওরগুলোয় ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। এ ধান কাটতে না পারলে অন্তত ২ লাখ টন চালের উৎপাদন কম হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সংকট ও উচ্চ খরচ, কম্বাইন্ড হারভেস্টর ব্যবহার করতে না পারা এবং ধানের দাম পড়ে যাওয়ার কারণে হাওরের কৃষকের সংকট আরও বেড়েছে।
ডিএইএর ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অধিকাংশ হাওর এখন নিমজ্জিত। ৭টি জেলার গড়ে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ ধান এখনো নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। পানিতে ডুবে থাকার কারণে পাকা ধান পচে যাওয়ারও খবর পাওয়া গেছে। শুধু হাওরগুলোতেই এ বছর ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল।
সরকারের প্রতিবেদন বলছে, হাওরগুলোতে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ দশমিক ৪৭ টন চাল উৎপাদন হওয়ার কথা। এ হিসাবে ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়লে কমপক্ষে ২ লাখ ৮ হাজার টন ধানের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এ অবস্থায় সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৩ মাস সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সে অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয় কাজও শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে। সেখানে ১৪ হাজার ৩৭১ হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে, যা ওই অঞ্চলের হাওরগুলোতে মোট আবাদের ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। এরপরই রয়েছে নেত্রকোনা। সেখানে ১১ হাজার ৫২২ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মোট আবাদের ২৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। বড় ক্ষতি হয়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরেও। সেখানে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। এ ছাড়া হবিগঞ্জে ৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ২ হাজার ১৬০ হেক্টর, সিলেটে ৫১০ হেক্টর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩৭২ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। তবে সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণে ধানের ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
গতকাল প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, ‘হাওরে যে ক্ষতি হয়েছে তা খুবই সামান্য। কারণ আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে তাতে কারও হাত থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহযোগিতা করার জন্য কাজ শুরু করেছি।’
কৃষি বিভাগ বলছে, সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। কৃষি বিভাগ হাওরভুক্ত ৭টি জেলা থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে কাজ করছে। তালিকা চূড়ান্ত হলে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
ডিএইএর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব শেষ হয়নি। ডুবে থাকা ধান অনেকে কাটার চেষ্টা করছেন। সেক্ষেত্রে কৃষক কিছু ধান সংগ্রহ করতে পারবেন। এগুলো বিবেচনায় নিয়েই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। পরে তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
এদিকে হাওরের কৃষকরা ডুবন্ত ধান নিয়ে মহাসংকটে পড়েছেন বলে জানা গেছে, কারণ ধান কাটার শ্রমিক মিলছে না। যদিও শ্রমিক পাওয়া যায়, তাতেও উচ্চ খরচ। স্বাভাবিক সময়ে শ্রমিকপ্রতি খরচ হতো ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে এলাকাভেদে ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা। কৃষকরা বলছেন, বাড়তি খরচ দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ পানিতে ডুবে থাকা অনেক কৃষকের ধান পচতে শুরু করেছে।
কৃষকরা বলছেন, স্বাভাবিক পরিবেশে একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৩ কাঠা জমির ধান কাটতে পারতেন। কিন্তু এখন পানিতে ডুবে থাকার কারণে দিনে এক কাঠা জমির ধানও ঠিকমতো কাটা যায় না।
জমিতে পানি থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কম্বাইন্ড হারভেস্টর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। যেসব হারভেস্টর কাজ করছে সেগুলোও আবার তিন থেকে চারগুণ বেশি ভাড়ায় খাটাতে হচ্ছে । সবমিলে কৃষকের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে যারা ধান কেটেছে তারাও তা বাজারে ঠিকভাবে বিক্রি করতে পারছেন না। কারণ বাজারে ধানের দাম কমে গেছে। আগে যেখানে ভেজা ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণপ্রতি বিক্রি হয়েছে এখন সেটা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় নেমে গেছে। গতকাল থেকেই সরকার হাওরে ধান ও চাল কেনার কার্যক্রম শুরু করলেও স্থানীয় পর্যায়ে হাওরাঞ্চলে দাম বাড়েনি বলে খবর পাওয়া গেছে।
এবার সারা দেশে ৫০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের তথ্য পাওয়া গেছে। সোয়া দুই কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও বন্যার কারণে শুধু হাওরাঞ্চলেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেই ধানের উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়েছে। বোরো মৌসুমের চালের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সারা বছরের জন্যই সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে শঙ্কা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।