সরকারি চাকরির মোহ ও মেধার সংকট

বর্তমানে তরুণদের বিশাল অংশের ধ্যান-জ্ঞান ও সাধনার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে,  বিসিএস তথা সরকারি চাকরি। ক্লাসরুম থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কিংবা আড্ডা ও খাওয়ার টেবিল, সর্বত্র ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন ও প্রস্তুতি। ক্লাসরুম থেকে শুরু করে, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা ডাইনিং টেবিল সব আলোচনায় ‘ক্যাডার’ হওয়ার স্বপ্ন। এ আকাক্সক্ষা শুধু শীর্ষ বিদ্যাপীঠের গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন দেশের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি স্তরে শিক্ষার্থীর হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। সরকারি চাকরির প্রতি তীব্র ঝোঁক, ব্যক্তিপর্যায়ে হয়তো একটি নিরাপদ জীবনের আকাক্সক্ষা থেকে তৈরি। কিন্তু জাতীয় উন্নয়ন ও মেধার সুষম বণ্টনের মাপকাঠিতে, এটি আমাদের সামনে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের এই তীব্র আকর্ষণের ভয়াবহতা বুঝতে হলে, আমাদের কিছু রূঢ় পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হবে। সাম্প্রতিক বিসিএস পরীক্ষাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি বিসিএস-এ গড়ে সাড়ে ৩  থেকে ৪ লাখ প্রার্থী আবেদন করছেন। অথচ দিন শেষে পদসংখ্যা থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার! এই বিপুল সংখ্যক তরুণ তাদের জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল ও প্রাণবন্ত সময়গুলোর কয়েক বছর স্রেফ একটি বা দুটি পরীক্ষার পেছনে ব্যয় করে চূড়ান্ত হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন এই তরুণরা চরম বিষন্নতায় ভোগেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং শ্রমশক্তির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মক্ষম জনশক্তি ৭ কোটির বেশি। এর মধ্যে মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ সরকারি বা আধা-সরকারি খাতে নিয়োজিত। বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষই কাজ করছেন বেসরকারি কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এই বেসরকারি খাতের অবদান ৮০ শতাংশের বেশি। অথচ বিস্ময়কর বিষয় হলো, দেশের শীর্ষ মেধাবীদের প্রথম ও একমাত্র পছন্দ সেই ৫ শতাংশের ক্ষুদ্র সরকারি খাত।

সরকারও এই বিপুল চাহিদার কথা জানে। গত ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, সরকার আরও পাঁচ লাখ কর্মচারী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। সরকারপ্রধানের এই ঘোষণা সরকারি চাকরি প্রত্যাশীদের এই অন্তহীন মিছিলকে যে আরও দীর্ঘায়িত করবে, তা বলাই বাহুল্য। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক বক্তৃতায় সরকারি চাকরি পেতে বিসিএস পরীক্ষাকে ঘিরে তরুণদের অতি-উৎসাহকে একটি ‘সামাজিক ব্যাধি’ বা সোশ্যাল ডিজিজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বিসিএসের ভাইভা বোর্ডে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আক্ষেপ করে বলেন, মৌখিক পরীক্ষায় অনেক প্রার্থী নিজের স্নাতকের বিষয়ের সাধারণ ও মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও ঠিকঠাক দিতে পারেন না। কারণ, প্রথম বর্ষ থেকেই তারা অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা শিকেয় তুলে চাকরির গাইড বই মুখস্থ করায় মত্ত থাকেন। এই প্রবণতা ঠেকাতে ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন তিনি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেকোনো মুহূর্তে ছাঁটাই হওয়ার আতঙ্ক থাকে। করোনা মহামারী বা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে আমরা বেসরকারি খাতের চরম অনিশ্চয়তা ও চাকরিচ্যুতির নির্মম বাস্তবতা দেখেছি। বিপরীতে, সরকারি চাকরিতে ছাঁটাই হওয়ার ঝুঁকি প্রায় শূন্য। সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো মেধার অসম বণ্টন। একটি রাষ্ট্রের সুষম আর্থসামাজিক ভারসাম্য ও সমৃদ্ধির জন্য সব সেক্টরে মেধাবীদের প্রয়োজন। যখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজন ইঞ্জিনিয়ার নিজের ফিল্ডে কাজ না করে, পুলিশ বা কাস্টমস ক্যাডার হওয়ার জন্য মুখস্থ বিদ্যায় জোর দেন, তখন রাষ্ট্র হারায় একজন দক্ষ কারিগর। যখন একজন চিকিৎসক বা কৃষিবিদ তার গবেষণা ছেড়ে দিয়ে প্রশাসনে যোগ দেন, তখন সেটি কেবল ওই ব্যক্তির ক্যারিয়ারের পরিবর্তন নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের অভ্যন্তরীণ মেধাপাচার। বেসরকারি খাত, গবেষণা, উদ্ভাবন, সাহিত্য, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আজ মেধাবীদের চরম আকাল।

সবাই যদি নিরাপদ, রুটিনমাফিক চাকরির খোঁজে ছোটেন, তবে বিশ্বমানের স্টার্টআপ তৈরি করবে কে? প্রযুক্তি বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে কে? যে দেশে মেধাবীদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবলই একটি নিরাপদ মাসিক বেতন ও পেনশনের চেক, সে দেশে নতুন ইলন মাস্ক, মার্ক জাকারবার্গ কিংবা অমর্ত্য সেন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। দেশের অর্থনীতিকে যদি আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে চাই, তবে এই ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য শক্তিশালী শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। চাকরির নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং উপযুক্ত বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে অভিভাবকের দায়িত্ব নিতে হবে। সরকার যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে, সেটিকে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য আরও লাভজনক, নিরাপদ ও বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে শেষ বয়সের নিরাপত্তার জন্য কাউকে শুধু সরকারি চাকরির মুখাপেক্ষী হতে না হয়। যারা স্টার্টআপ বা নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য জামানতবিহীন ব্যাংকঋণ ও ট্যাক্স হলিডে নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। সমাজ, পরিবার এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একজন কৃষক, একজন ফ্রিল্যান্সার বা একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর অবদান যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কোনো অংশে কম নয়, এই বোধটি জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।

সরকারি চাকরি অবশ্যই সম্মানজনক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সৎ ও মেধাবী আমলার বিকল্প নেই। কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু আমলাতন্ত্র দিয়ে হয় না। কারখানার চাকা ঘোরানো থেকে শুরু করে, মহাকাশ গবেষণা সব জায়গায় শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পদচারণা থাকতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের বৈষম্য কমিয়ে এনে সব পেশায় সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা সরকারি চাকরির মোহ থেকে যদি তরুণ প্রজন্মকে বের করে আনতে পারি। ঠিক সেদিনই বাংলাদেশ একটি প্রকৃত অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধির পথে পা বাড়াবে।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

silmybd@gmail.com