আমরা ভাগ হয়েই গেলাম

গতকাল এ লেখা যখন লিখছি, তখন দুপুর ১২টাও বাজেনি। ফলে সরকারিভাবে বলা যাবে না, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে। কিন্তু  ট্রেন্ড যা তাতে খুব কিছু এদিক-সেদিক না হলে, নিশ্চিতভাবেই বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। এর আগে, খবরের কাগজে না লিখলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলাম, হাওয়ার গতিক দেখে মনে হচ্ছে এবার বিজেপি জিতবে। বলেছিলাম যে, ভোট যদি সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস আসবে। কিন্তু ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং হলে বিজেপি। বাস্তবে তাই ঘটছে। তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলের বোঝা উচিত ছিল যে, নির্বাচন কমিশন থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক দপ্তরের পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে অতি সক্রিয়তা মোটেও গণতন্ত্র বাঁচাতে নয়। লাখ লাখ নাগরিকের নাম বাদ দিয়ে যে নির্বাচন, তা আদৌ কতটা বিধি বা গণতন্ত্র সম্মত, তা নিয়ে প্রথম থেকেই সোচ্চার হওয়া দরকার ছিল বিরোধীদের।

তারা নামকাওয়াস্তে আন্দোলন আন্দোলন খেলে, সরকার পক্ষকে অ্যাডভান্টেজ দিলেন। ফলে তখনই বিজেপির কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, বিরোধী শক্তি মুখেই বাঘ। আসলেই সে বেড়াল। খুব স্বাভাবিকভাবেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল সর্বশক্তি নিয়ে। নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ থেকে এমন কোনো নেতা নেই যে, এ রাজ্য ঘুরে ঘুরে কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করেননি। দল হিসেবে বিজেপি কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ রাজ্যে জিতলেও,  সর্বত্রই তাদের বুথ লেভেল পর্যন্ত সংগঠন আছে তাও নয়। কিন্তু তাদের পেছনে আরএসএসের বিপুল নেটওয়ার্ক নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। বহুবার বলেছি, আবারও মনে করিয়ে দেব ভারতের যে কোনো রাজ্যের চেয়ে তাত্ত্বিকভাবে এ রাজ্যে আরএসএস ও তাদের একাধিক সংগঠনের ভিত্তি অনেক, অনেকগুণ বেশি। ভুলে গেলে চলবে না, এ রাজ্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। ভুলে গেলে চলবে না, পাঞ্জাব ছাড়া এ রাজ্যেই ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসা মানুষের ভিড় বেশি।

যুক্তির খাতিরে বলাই যায় যে, ১৯৪৭-৫০-এ ওপারের যে হিন্দু বাঙালি এপারে চলে এসেছিলেন, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক এখন যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত। তাদের বেশিরভাগই সচ্ছল, এলিট। কিন্তু হালে তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যে মুসলমান বিদ্বেষ চারিয়ে দিতে পেরেছে বিজেপি। কয়েক বছর ধরে এই বঙ্গে ১৯৪৬-এর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, নোয়াখালী দাঙ্গা, দেশভাগ নিয়ে বিপুল চর্চা বেড়েছে। দেশভাগের ওপর দিস্তে দিস্তে লেখা হচ্ছে, সিনেমা হচ্ছে, নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশভাগের একপাক্ষিক ক্ষত আবার খুঁচিয়ে তোলা হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। ১৯৪৭-এ যে উচ্চবর্গের হিন্দু, বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন, তারাই ফের নতুন করে পড়শি সম্প্রদায়ের সম্পর্কে প্রবল অনীহায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এই বিদ্বেষ জর্জরিত মন,  বিজেপিকে বেছে নেবে তাতো অস্বাভাবিক নয়।  আপনি মার্কসবাদী হন বা না হন দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াতে ঘুণ বাইরে থেকে দেখা না গেলেও, কখন সে সমাজের ভেতরে চারিয়ে গেছে তা হয়তো টের পাননি। বিজেপি নয়, চরম মনুবাদী রাজনীতি এ রাজ্যে ধীরে ধীরে কবে থেকে ঢুকে পড়েছে, তা হয়তো খেয়াল করেননি বলেই এখন গেল গেল রব তুলছেন। বিজেপির সমর্থক কারা! কলকাতার বাবু ভদ্দরলোকজন, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশ, মফস্বল, গ্রামের বাউড়ি, বাগদী, আদিবাসী সাঁওতাল, ওঁরাও, মুর্মুদের সংখ্যা গরিষ্ঠ, ছোট পুঁজির দোকানদার, ব্যবসায়ী, চাকুরে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এটা ঠিক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ১৫ বছর ধরে মনুবাদী রাজনীতির পথ প্রশস্ত করে গেছেন। হু হু করে বেড়েছে আরএসএসের শাখা। এমন জেলা নেই, যেখানে আরএসএসের শাখা বা তাদের পরিচালিত বনবাসী কল্যাণ কেন্দ্র বা সরস্বতী মন্দির কয়েকগুণ বাড়েনি। কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মোকাবিলা করতে, মমতা নরম হিন্দুত্ববাদের পথ নিয়েছেন। রাম মন্দির নিয়ে মুসলিম ক্ষোভে প্রলেপ দিতে তিনি, বিশাল জগন্নাথ মন্দির গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে দীঘাতে। পাশাপাশি গণতন্ত্রের ভিন্ন পরিসর স্তব্ধ করতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা খুব কিছু গৌরবের নয়। সব স্বৈরাচারী শাসকের মতো তিনি চাটুকার কবি-শিল্পী-বুদ্ধিজীবী তৈরি করে গেছেন। এই চাটুকারেরা সভাকবির মতো, নিয়মিত মমতার স্তুতি করে গেছেন। একদা জননেত্রী মমতা কবে, কখন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন তা টেরও পাননি। দুর্নীতি এখন সমাজের কাছে গ্রহণীয় হয়ে গেছে, ফলে ওটি এবার অন্তত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সেভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই ছিল না। তাই তা নিয়ে আলোচনা এই মুহূর্তে অর্থহীন। পাশাপাশি বামেদের মূল শক্তি সিপিআইএম ছিল একদা ক্যাডারভিত্তিক দল। সে পথ থেকে অনেক, অনেক দিন সরে সে হয়েছে, মাস পার্টি বা জনগণের দল। বলাবাহুল্য এই জনগণের বড় অংশ শহর মফস্বলের মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন। অধ্যাপক, শিক্ষক, সরকারি বড় চাকুরে। পার্টির নীতিনির্ধারণে কৃষক, শ্রমিক, গ্রামীণ সর্বহারার চিহ্নমাত্র নেই।

তৃণমূল কংগ্রেস যেহেতু সিপিআইএমকে গদিচ্যুত করেছিল, ফলে তারাই সিপিআইএমের মূল শত্রু। তাদের উৎখাত করতে অনেক সময়ই, সিপিআইএম বাহিনীর কথাবার্তায় বিজেপির সুর কেমন যেন এক হয়ে যায়।

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে তো সিপিআইএম ও বিজেপির ন্যারেটিভ পুরোপুরি এক। বিজেপির প্রচারে দুটো ইসু্যু ছিল এবার জোরদার বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন এবং হাসিনা পরবর্তী সময়ে মৌলবাদী, জঙ্গি হয়ে যাওয়া এবং ওপার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা ও মুসলিম অনুপ্রবেশ। বামপন্থি দলগুলো এই ন্যারেটিভ নিয়ে সোচ্চার হওয়া দূরে থাক, তারা পুরোপুরি বিজেপি ন্যারেটিভের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।   স্বৈরতন্ত্রের উত্থান তখনই হয়, যখন সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।

পশ্চিমবঙ্গের বর্ণবাদী সমাজ, ১৯৪৭-এ ফিরে গেছে। ফলে শেষ রায় কার পক্ষে যাবে, তা নিয়ে আলোচনা চলবে, চলতেই থাকবে। আগামী দিনে গবেষণাও হবে। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করবেন প-িতরা। কিন্তু এটা পরিষ্কার আমরা দুই পড়শি সম্প্রদায়, আবার আনুষ্ঠানিকভাবে ওরা-আমরায় ভাগ হয়ে গেলাম। কী বিচিত্র রাজনীতি, আমরা কেবলই নীরব দর্শক!  হয়তো ইতিহাস এভাবেই ফিরে ফিরে আসে। ১৯০৫ যে এলিট অভিজাতরা, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিল, ১৯৪৭-এ তারাই ছিল বঙ্গভাগের পুরোভাগে। এবার ২০২৬ ফের আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ না হলেও, মানসিকভাবে যে ভাগ তার পেছনে নেতৃত্বে ছিলেন নিঃসন্দেহে ভদ্দরলোক হিন্দুরাই। জানি না ভবিষ্যতে এসব কথাও আর লিখতে পারব কি না! হতে পারে এ আমার শেষ লেখা। পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আরও যাবে। কলকাতার আকাশে এখন কালো মেঘ। কাব্য করে বললে, পশ্চিমবঙ্গের আকাশে এখন দুর্যোগের ঘনঘটা।

২৭ লাখ লোকের ভোটার তালিকা থেকে যে নাম কাটা গেছে, তাদের ভবিষ্যৎ তো নিশ্চিত ঘন অন্ধকার। অনেকেই পার্ক সার্কাস ময়দানে দিনের পর দিন ধরনা দিচ্ছেন। বলা কঠিন, কতদিন আর তারা বিচ্ছিন্নভাবে এই আন্দোলন চালাতে পারবেন! বে-নাগরিক হয়ে কোথায় তাদের ঠাঁই হবে, ভাবতেও বুকের মধ্যে কাঁপুনি ধরছে। অনেক বাম সমর্থক সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন যে,

তৃণমূল কংগ্রেসের পতন মানে, এবার সরাসরি লড়াই চরম মনুবাদের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির। বিজেপি বনাম কমিউনিস্টদের। এদের, করুণা করা ছাড়া উপায় নেই। নিয়মতান্ত্রিক বামেরা রাষ্ট্রের কাছে নিতান্ত ঢোঁড়া সাপ। রাজ্যে মমতা চাইলে, সংঘ পরিবারের এমন বাড়বাড়ন্ত হতো না।

যদি ফের কখনো বামেরা মেদ ঝরিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে ফিরতে পারে, তখন ছবিটা হয়তো অন্যরকম হবে। আপাতত কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। এটাও বলব অন্ধকার কখনো, কোথাও চিরস্থায়ী হয় না। ভোটের হার মানেই সবশেষ হয়ে যাওয়া নয়। আজ যা জয়, আগামী দিনে তাই পরাজয়ের সূচনা। আশা ছাড়তে নেই, বিশ্বাসও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো কবেই বলে গেছেন, ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’।

লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com