একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা সেই হাম ফিরে এসেছে ভয়ঙ্কর রূপে। প্রতিদিনই খালি করছে কোনো না কোনো মায়ের কোল। আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে হাসপাতাল চত্বর কিংবা বাড়ির আঙিনা। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলো এখন কান্না আর উদ্বেগে ভরা। একদিকে শয্যার সংকট, অন্যদিকে অভিভাবকদের আতঙ্ক। হামে মৃত্যু গতকাল ৩০০ ছাড়িয়েছে। গত ৫০ দিনে সৌরভ ছড়ানোর আগেই ঝরে গেছে ৩১১ ফুটন্ত ফুল। প্রতিটি মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়; একটি স্বপ্নের মৃত্যু, যেন একটি পরিবারে বিরাট ক্ষত আর অনেক বড় শূন্যতা, যা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। চিকিৎসকরা বলছেন, এই মৃত্যু শুধু একটি ভাইরাসজনিত কারণে নয়; অবহেলা, টিকা-ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবের সম্মিলিত ফল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে গতকাল এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের দুজন হামে এবং ১৫ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এর আগে এক দিনে হামজনিত সমস্যায় এত শিশুর মৃত্যু হয়নি। এ নিয়ে হামে ৫২ ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত দেড় মাসে হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৪১ হাজার ৭৯৩ জন। সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ হাজার ৮৪২ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ জনের। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৫ হাজার ১৫১ জন।
গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৫৪ জনের শরীরে। সন্দেহজনক হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এক হাজার ৩০২ জনের। তাতে মোট হামজনিত রোগী পাওয়া গেছে এক হাজার ৪৫৬ জন। ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৭ শিশুর মধ্যে ১২ জন ঢাকা বিভাগের এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ জন রয়েছে।
অধিদপ্তরের পাঠানো তথ্যে বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে হামে মৃত্যু ও শনাক্ত সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। ২৪ ঘণ্টায় ‘সন্দেহজনক’ আক্রান্তের মধ্যে সর্বোচ্চ ঢাকা বিভাগে ৬১৮ জন। এর মধ্যে ১১১ জনের নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ১৬৮ জনের মধ্যে ১৬ জন, সিলেট বিভাগে ৫১ জনের মধ্যে ১৮ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১২ জনের মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৯ জনের। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯২, বরিশালে ১৩৩, খুলনা বিভাগে ৮৮ জন এবং রংপুরে ৪০ জনের মধ্যে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ পাওয়া গেলেও নিশ্চিত হামের কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।
সরকারি হিসাবে বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ‘সন্দেহজনক হামে’ সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে; ১২৭ জন। এ বিভাগে হামে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ শিশুর। এর পরেই রয়েছে রাজশাহী বিভাগে ৭০ জন, চট্টগ্রামে ২৫, সিলেটে ১৪, খুলনায় ১৩ এবং বরিশালে ১০ জন।
গত ২ এপ্রিল প্রথম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে হাম পরিস্থিতির প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৮ দিনে হামে ১৩ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওই পর্যন্ত ৪০ জনের হামজনিত মৃত্যু হয়। সন্দেহজনক হামের রোগী ছিল তিন হাজার ৭০৯ জন। হাম শনাক্ত হয়েছিল ৫৮৫ জনের। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৩৬৩ জন।
এরপর ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হামে ৪৯ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ২২৭ জনের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ ২৮ দিনে হামে আরও ৩৬ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ২০০ জনের মৃত্যু হয়। গত ৫০ দিনে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৩১১ জনের অর্থাৎ দিনে ৬ জনের বেশি করে মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম ১৮ দিনের তুলনায় পরবর্তী ১৮ দিন অর্থাৎ ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক রোগী এবং হাম শনাক্ত ও মৃত্যু হয়েছে অনেক বেশি। ২ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত হামে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। যেখানে প্রথম ১৮ দিনে মৃত্যু হয় ১৩ জনের। হামে মৃত্যু বেড়েছে ৬৪.৮৬ শতাংশ। হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৫৬ জনের। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়েছে ১১৭ শতাংশ। এই ১৮ দিনে হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৮০। হামজনিত মৃত্যু বেড়েছে ১২২ শতাংশ। ২০ এপ্রিল থেকে গতকাল ৪ মে পর্যন্ত ১৪ দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯১ জনের। এর মধ্যে হামে ১৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৭৬ জন। দ্বিতীয় ১৮ দিনের তুলনায় তার পরের ১৪ দিনে মৃত্যু নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। কমেছে ৫০ শতাংশ। প্রথম ১৮ দিনে গড়ে ২.২২ জন, দ্বিতীয় ১৮ দিনে গড়ে ১০ জন করে এবং পরের ১৪ দিনে ৬.৫ জন করে হামজনিত মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা না নেওয়া বা টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অনেক জায়গায় এখনো টিকা নিয়ে ভুল ধারণা, ভয় কিংবা অবহেলা রয়েছে। ফলে শিশুরা সুরক্ষার বৃত্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় জরুরি হয়ে উঠেছে সমন্বিত উদ্যোগ। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা কার্যক্রম জোরদার করছেন, সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, টিকা দেওয়ার পর শিশুর শরীরে ইমিউনিটি তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগবে। সেই সময়ের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, শিশুরা আক্রান্ত হলে বাসায় না রেখে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। বাসায় থেকে জটিল হয়ে হাসপাতালে এলে তখন আর কিছু করার থাকে না। স্বাস্থ্য খাতে বেহাল অবস্থা। বিগত আওয়ামী সরকারের সময় পুরোপুরি কমার্শিয়াল করে ফেলা হয়। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সংকট। অথচ বেসরকারি হাসপাতালে সবই আছে। কেন? তাদের লোকদের ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া। এসব কারণে এখন মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। তখন তো কথা বলা যেত না। এখন কথা বলা যায়। কোনো সমস্যা অ্যাড্রেস করলে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন। আমি লক্ষ্য করেছি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা আছে। তিনি এসব পরিবর্তন করতে চান। আশা করি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তিনি সেভাবে সমাধান করবেন। শিশুদের এভাবে মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এখন ৯ মাসের কম বয়সী শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। তার মানে, মায়ের কাছ থেকে যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পাওয়ার কথা, তা হয়তো পাচ্ছে না। সে জন্য গর্ভবতী হওয়ার আগে মায়েদেরও টিকা দেওয়ার বিষয়ে ভাবতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, এগুলো তো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। অন্তর্বর্তী সরকারের অকার্যকারিতায় হামের মহামারী হয়েছে। এখন জরুরি অবস্থা ও মহামারী ঘোষণা করা এবং একই সঙ্গে আপদকালীন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে কার্যক্রম চালানো দরকার। কেননা, আমি বিশিষ্ট শিশুবিশেষজ্ঞদের যে বিভিন্ন পরামর্শ দেখছি, সেগুলো সারা দেশজুড়ে যদি ভালোমতো প্রশিক্ষণ না দেওয়া যায়, একটা ন্যাশনাল গাইডলাইন তৈরি না করা হয়, তাহলে সব ডাক্তার এই মানের সেবা দিতে পারবেন না। তা যদি না পারে, তাহলে শিশুর অবস্থা যদি বেশি খারাপ হয়ে যায়, বাইরে থেকে যখন ঢাকায় আসবে, তখন আর তেমন কিছু করার থাকে না। সেই ঘটনাটা ঘটছে। ঠিক তো ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে না। এখন এটা নিয়ে জোরেশোরে নামা উচিত, যেন আর কোনো শিশুর মৃত্যু না হয়। যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে যতদিন আক্রান্ত হতে থাকবে, ততদিন মৃত্যুও হতে থাকবে।
হাম প্রতিরোধে সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু করেছে। এরপর ১২ এপ্রিল শুরু করে ৪টি সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, এক কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার ২২২ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেটে টিকার লক্ষ্যমাত্রা একটু কম পূরণ হয়েছে। বরিশালে ৯৭ শতাংশ, রাজশাহীতে ৯৫, রংপুরে ৯৪ ও সিলেটে ৯৭ শতাংশ। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১০৩ শতাংশ, ঢাকায় ১০১, খুলনায় ১০১ ও মংমনসিংহে ১০৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে।