স্বার্থ রক্ষা করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ

ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তবর্তী পাঁচটি রাজ্যের চারটিতেই দলটি সরাসরি অথবা তাদের সমর্থিত সরকার ক্ষমতাসীন হলো। তবে বাংলাদেশের দীর্ঘ পশ্চিম-সীমান্তের ওপারের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দলটি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর নানামুখী প্রভাব পড়বে, এমনটি মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সরকারের ভেতরকার বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ক্ষমতায় পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে, তা বিবেচনায় নিলে আগামী বছরগুলোয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল রেখে দেশের স্বার্থের বিভিন্ন দিক রক্ষা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে।

তারা বলেন, বিজেপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বাংলাদেশ ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব ও প্রচার আছে। আর ‘বিদেশি অনুপ্রবেশ’ দলটির একটি বড় রাজনৈতিক এজেন্ডা; নির্বাচনী ইশতেহারেও যার উল্লেখ আছে। ‘সন্দেহভাজন’ ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ প্রতিবেশী দেশে ঠেলে দেওয়া (পুশ ইন) সমর্থন করে বিজেপি। আর প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের বিষয়ে, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিষয়ে দলটির স্পর্শকাতরতা আছে। সব মিলিয়ে এসব বিষয় আগামী দিনগুলোয় বারবার সামনে আসতে পারে।    

বেসরকারি বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগের ব্যাপার ‘আছে’, আবার ‘নেই’ এমন দ্বৈত পরিস্থিতি উদ্ভূত হতে পারে। তবে ঢাকা ও দিল্লি থেকে দুই দেশের কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে সম্পর্কের বিষয়গুলো ও মতভেদ সামাল দেয়, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, বিজেপি জেতায় পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। মুসলিম-বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড বাড়ার আশঙ্কা আছে; এবং এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে।

তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার ভালো দিকও আছে, এমনটি মনে করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয়ভাবে বিজেপি ক্ষমতায় থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে অনেক বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর দেশটির সরকারের কার্যত নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এখন বিজেপি কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় স্থানে ক্ষমতায় থাকায় দুই দেশের মধ্যে সরকারি-পর্যায়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে যেমন থাকবে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে সম্পর্কও তেমনই থাকবে।

বাংলাদেশ ও ভারত তিস্তার পানি ভাগাভাগির চুক্তির খসড়া ২০১০ সালে চূড়ান্ত করেছে। বর্তমান বিজেপি দলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও সাবেক কংগ্রেস দলীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের স্পষ্ট দালিলিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতার অজুহাতে দেশটি এখনো তিস্তা চুক্তি সই করেনি।

বাংলাদেশের পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব দিকে ভারতের সঙ্গে প্রায় ৪ হাজার ৯৭ কিলোমিটার (২ হাজার ৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে।

কূটনীতিকরা বলছেন, ভারতের বৈদেশিক সম্পর্ক কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয় হলেও বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে কাকে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেবে, তার ওপরও নৈমিত্তিক সম্পর্কের কিছু বিষয় নির্ভর করতে পারে।

ভারতের অন্যতম প্রধান ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিধানসভার বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য বিজেপির বর্তমান সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ ও সুকান্ত মজুমদারের মধ্যে যেকোনো একজনকে মুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারে।

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অন্য রাজ্যগুলোর মধ্যে বিজেপি ত্রিপুরায় মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা ও আসামে হিমন্ত বিশ^ শর্মার নেতৃত্বে ক্ষমতায় রয়েছে। মেঘালয়ে বিজেপিসহ স্থানীয় কয়েকটি দলের সমর্থনে কনরাড কে সাংমার নেতৃত্বে স্থানীয় রাজনৈতিক দল জাতীয় গণদল ক্ষমতায় রয়েছে। আর মিজোরামে ক্ষমতায় আছে স্থানীয় পর্যায়ের দল জোরাম গণআন্দোলন, মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমার নেতৃত্বে।

বাংলাদেশের দুজন ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ভারত বাংলাদেশে কেবল তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রাখত। ঢাকায় ক্ষমতায় পালাবদল হয়েছে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়মিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমন বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে হলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির স্থিতিশীল রাখা, অভিন্ন নদী গঙ্গার পানি ভাগাভাগির চুক্তি নবায়ন, আরেক অভিন্ন নদী তিস্তার চুক্তি সই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সীমান্ত শান্ত রাখা দরকার হবে। এ ক্ষেত্রে, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত ও যোগাযোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন হবে। 

বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার মনে করে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোয় বিজেপির উত্থান দুই দেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে যেই ক্ষমতায় আসুক বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।’ গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি একথা বলেন।

বাংলাদেশ নিজেদের স্বার্থ বজায় রেখে কাজ করবে, এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ আশাবাদী। পুশইন নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা হবে। প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ভারতের ভিসা প্রক্রিয়া শিগগিরই স্বাভাবিক হবে।