এক বছরে ৫০টি বস্ত্র ও পাটকল চালুর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পয়লা মে’র বক্তৃতায় তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনী ওয়াদা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্বাচনের সময় তিনি খুলনায় শ্রমিক দলের সমাবেশে তাদের দাবিতে সায় জানিয়ে এই ওয়াদা করেছিলেন। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার জুট মিলস করপোরেশনের ২৫টি কারখানা বন্ধ করে দেয়। এতে সরাসরি বেকার হয়ে পড়ে ২৫ হাজার স্থায়ী ও ২৫ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক। এ ছাড়া খরচ কমানোর অজুহাতে ১৫টি সরকারি চিনিকলের মধ্যে ৬টির উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়। টেক্সটাইল মিলসের মধ্যে ২৫টির উৎপাদন বন্ধ। গ্যাস সংকটের কারণে কিছু সার কারখানারও উৎপাদন বন্ধ। বন্ধ রয়েছে বেসরকারি খাতের শত শত পোশাক শিল্পকারখানা, চামড়াশিল্প, ছোট-বড় অসংখ্য ম্যানুফাকচারিং প্ল্যান্ট। সব মিলিয়ে শিল্প সেক্টরের বিভিন্ন খাতে যে অচলাবস্থা, তা অর্থনৈতিক সচলতাকে অনেকটা গতিহীন করেছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে বন্ধ করে দেওয়া পাটকলগুলোকে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় খুলে দেওয়ার যে উদ্যোগ গৃহীত হলো তাকে সাধুবাদ জানাই।
পাটশিল্পে আমাদের অবস্থা রমরমা না হলেও, এর বিকাশ হচ্ছিল ক্রমান্বয়ে। এই শিল্পকে পরাধীন ও স্থবির করে দেওয়ার প্রধান সিদ্ধান্ত ছিল আদমজি পাটকল বন্ধ করে দেওয়া। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের ‘পাটনীতি’ একে ধসের প্রান্তে নিয়ে যায় এভাবে যে, ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশে পাট রপ্তানি করা যাবে না। তার শেষ কোপটি ছিল খুলনার জুট মিলস বন্ধ করে বেকারত্বের ঘানি চাপিয়ে দিয়ে। মূল লক্ষ্য, শিল্প সেক্টরকে ধসিয়ে দিয়ে আমদানিনির্ভরতা সৃষ্টি করা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সব খাতকে আমদানিনির্ভর করায় আমরা আর্থিক স্থিতিশীলতা হারাচ্ছি।’ আমদানি নির্ভরতা যে পরাধীনতারই নামান্তর, এই সত্য আমরা আজ বুঝতে পারছি। আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারও তা উপলব্ধি করতে পারছে। সে কারণেই লুটরাজত্ব থেকে সেগুলোকে বাঁচাতে, বন্ধ কারখানা চালু করে বেকারদের পুনরায় কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে সরকার। তবে এখানেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। পিপিপির আওতায় যেন লুটেপাটে খাওয়া শিল্পপতিদের হাতে না যায়, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে বড় বিনিয়োগ যেমন হবে, তেমনি পুনর্বাসিত হবেন চাকরি হারানো দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক। একটি পরিবেশবান্ধব শিল্প সেক্টর হিসেবে গড়ে উঠুক পাট, চিনি, বস্ত্র ও অন্যান্য শিল্প। যা আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গতি আনতে সহায়ক হবে। এ বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাদের দক্ষতা ও অগ্রগতি চিন্তার ফসল হয়ে উঠুক বন্ধ কলকারাখানাগুলো, জাতি সেটাই দেখতে চায়।
সরকারের সদিচ্ছাকে অর্থবহ করতে হলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের মানবিক ও মানসিক ঐশ্বর্যের অধিকারী হতে হবে। রাজনীতিকে সরকার যেমন অগ্রগতির সোপান করে তোলার একটি যাত্রা হিসেবে তুলে ধরেছে, তেমনি প্রশাসনকেও, বিশেষ করে মিড লেভেলের কর্মকর্তাদের, কারখানার দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রাণপণ প্রয়াস নিতে হবে। যারা বিনিয়োগ করে অংশীজনে পরিণত হবেন, তাদের দক্ষতা ও পরিকল্পাকেও বাস্তব ও সুদূরমুখী হতে হবে। সময়ক্ষেপণ করে পরিকল্পনাকে যাতে ব্যাহত না করতে পারে কোনো পক্ষ, সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে সবাইকে। প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মসংস্থানমুখী নীতি ও তার বাস্তবায়ন প্রয়াস আমাদের উৎসাহিত করছে। সব রকম অবহেলা দূরে ঠেলে দিয়ে যাতে নির্মোহভাবে পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে পারে দায়িত্বশীল ও বিনিয়োগকারীরা, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।