তৃণমূলের হাতেই তৃণমূলের হার!

ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গত এক দশকেরও বেশি সময় বিজেপির দাপট থাকলেও, দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে আধিপত্য ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। ২০১১ সালে রাজ্যটিতে প্রতাপশালী বামপন্থিদের ৩৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটানো এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির অন্যতম প্রধান সমালোচক হয়ে উঠেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নিজের সেই প্রভাব আর ধরে রাখতে পারলেন না মমতা; গেরুয়া শিবিরের জোয়াড়ে তছনছ হয়ে গেছে তার ১৫ বছরের সাজানো বাগান। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ২০৭ আসনে জয় নিয়ে নিজেদের ইতিহাসে রাজ্যটিতে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই জয়ের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। যে রাজ্যটিতে বরাবরই ব্রাত্য থাকা বিজেপির এই উত্থান যে হয়েছে মমতারই এক সময়ের ঘনিষ্ঠজন শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে। এক সময়ের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং পূর্ব মেদিনীপুরে তৃণমূলের উত্থানের অন্যতম কারিগর শুভেন্দু অধিকারী এখন বিজেপির নতুন মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে সামনের সারিতে রয়েছেন। বিশ্লেষকরা তাই মনে করছেন, নিজ ঘরের কাঁটাতেই পা কেঁটেছে মমতার। এর পাশাপাশি রাজ্যটিতে ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) রেকর্ড সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া এবং মুসলিম ভোটে বিভক্তির সুফল পেয়েছে বিজেপি।

গত বছরের নভেম্বর মাসে বিহারে এনডিএ জোটের বড় জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘বিহার হয়েই গঙ্গা নদী বাংলায় প্রবাহিত হয়’। এই রূপকটিই ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সুর বেঁধে দিয়েছিল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল। পাঁচ মাস পর, অবশেষে দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত এই পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যটি দখল করল বিজেপি। আর যার হাত ধরে বিজেপির এই উত্থান সেই শুভেন্দু অধিকারীকে বলা হতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেনাপতি’। ২০১১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার পেছনে নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন শুভেন্দু; এটিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানে তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও আপসহীন নেতৃত্ব বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

তবে ২০২১ সালের নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে তার বিজেপিতে যোগ দেওয়া তৃণমূল নেত্রীর জন্য বড় ধাক্কা ছিল। সে সময় নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে শুভেন্দু বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের সঙ্গে শুভেন্দুর দূরত্ব তৈরির পেছনে মূলত দলীয় কাঠামোর পরিবর্তন এবং নেতৃত্বের ভারসাম্য নিয়ে অসন্তোষ কাজ করেছে। বিশেষ করে তৃণমূলের যুব নেতৃত্বে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান এবং শুভেন্দুকে সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এই ফাটলকে আরও প্রশস্ত করে। পরবর্তী সময়ে প্রশান্ত কিশোরের কৌশলগত অবস্থান শুভেন্দুর দলত্যাগের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এবারও মমতাকে নিজ আসন ভবানীপুরে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়েছেন শুভেন্দু। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে ব্যর্থ হয়ে ৭৭টি আসনে আটকে গেলেও, শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতার পদ পান। এরপর টানা পাঁচ বছর তিনি বিধানসভার ভেতরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আগ্রাসী ভূমিকা পালন করেন। ওই নির্বাচনে পরাজয়ের পর সবাই ভেবেছিল বিজেপি ধুয়ে-মুছে যাবে। কিন্তু সেই সময় শুভেন্দু অধিকারী দলের হাল ধরেছিলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা মোকাবিলা করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। কেবল পূর্ব মেদিনীপুর নয়, বরং পুরো রাজ্যের নেতা হয়ে ওঠেন শুভেন্দু অধিকারী।

এসআইআর বিতর্ক ও মুসলিম ভোটে বিভক্তি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এ রেকর্ড সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া এবারের বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল; যা বদলে দিয়েছে ভোটের ফল। নির্বাচনের আগেই রাজ্যের ৯০ লাখের বেশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বা নাম সংশোধনের আওতায় আসায় তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। দেশটির নির্বাচন কমিশনের দাবি ছিল, এই ভোটারদের কেউ মৃত, কেউ অন্য খানে চলে গেছেন, কারও নাম একাধিক স্থানে ভোটার হিসেবে রয়েছে, কাউকে তাদের ঠিকানায় পাওয়া যায়নি; অর্থাৎ ভুয়া ভোটার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, ভোটে হারাতে না পেরে বিজেপি এবার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে গোড়ায় কোপ মারতে চাচ্ছে। তিনি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেও বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন বিজেপির হয়ে কাজ করছে। এসআইআর প্রক্রিয়া ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলতে পারে এবং তৃণমূল ভোট হারাতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল মমতার।

আর এখন নির্বাচনে হেরে ক্ষমতা হারানোর পর দলটি হিসাব-নিকাশ করে দেখছে, কীভাবে ভোট গণনায় এসআইআর-এর প্রভাব বদলে দিয়েছে বিজেপি এবং তৃণমূলের ভোটের ফল। ভোটার তালিকা থেকে বেশি নাম বাদ পড়া এলাকাগুলোতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাফল্য কমেছে এবং বিজেপি সেখানে বড় জয় পেয়েছে। ভারতীয় পত্রিকা এনডিটিভি’র এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে ১৪৭টি আসনে ২৫,০০০-এর বেশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, তার মধ্যে বিজেপি ৯৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। তৃণমূল সেখানে মাত্র ৫১টি আসন পেয়েছে; কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ১টি। ৬৭ আসনের যেখানে ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, সেখানে বিজেপি পেয়েছে ৪৭ আসন এবং তৃণমূল পেয়েছে ১৯ আসন। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও উত্তর ২৪ পরগনার মতো এলাকা যেখানে বেশি ভোটারের নাম বাদ গিয়েছিল, সেখানে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলাগুলোতে বিপুল সংখ্যক ভোটার (মুর্শিদাবাদে ৪.৫৫ লাখের বেশি, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩,২৫,৬৬৬ এবং মালদায় ২৩৯,৩৭৫ জন) বাদ পড়ায় তৃণমূলের আসন কমেছে। তৃণমূল ২০২১ সালের ২০টি আসনের তুলনায় এবার মাত্র ৯টি আসন পেয়েছে।

পাশাপাশি নির্বাচনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত তিনটি জেলায় মুসলিম ভোটের বিভাজন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জেলাগুলোতে ভোটের মেরূকরণ ও ভাগাভাগির ফলে বিজেপি অতিরিক্ত ১০টি আসনে জয়লাভ করেছে। কলকাতাভিত্তিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলা এবার এক অনন্য নজির গড়েছে। ২২টি বিধানসভা আসন বিশিষ্ট এই জেলায় এবার পাঁচটি ভিন্ন রাজনৈতিক দল জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ৯টি, বিজেপি ৮টি, কংগ্রেস ২টি, হুমায়ুন কবিরের দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেউপি) ২টি এবং সিপিএম ১টি আসনে জয় পেয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মুর্শিদাবাদের ফলাফলকে তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ২০২১ সালে এই জেলায় তৃণমূল ২০টি আসন পেয়েছিল, আর বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২টি। এবারও তৃণমূল মালদা ও উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোর ওপর ভরসা করেছিল, কিন্তু ভোট পাঁচ ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় তৃণমূলের আসন সংখ্যা অনেকটা কমে গেছে। তথ্য অনুযায়ী, এই তিনটি জেলায় মোট ৪৩টি বিধানসভা আসন রয়েছে। ২০২১ সালে তৃণমূল এর মধ্যে ৩৫টিতে জিতেছিল এবং বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৮টি। এবার চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। ৪৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ১৮টিতে, তৃণমূলের ঝুলিতে গেছে ২০টি। বাকি ৫টি আসন ভাগ করে নিয়েছে কংগ্রেস, এজেউপি ও সিপিএম। মোদি যেমন বিহারে এনডিএ জোটের জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গকে লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন, ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামে ঐতিহাসিক জয়ের পর শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, বিজেপির লক্ষ্য এখন ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। নিজের জয়কে ‘রাজনৈতিক নাটকীয়তা’ হিসেবে অভিহিত করে শুভেন্দু বলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তেজস্বী যাদব ও রাহুল গান্ধী শেষ। এবার লক্ষ্য অখিলেশ যাদব। আগামী বছর উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে অখিলেশই বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।