পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান ইতিহাসের নতুন পাঠ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে ‘রাজনৈতিক অলৌকিক ঘটনা’ বলার যথেষ্ট কারণ আছে। পনেরো বছর পর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অভূতপূর্ব উত্থান প্রথমে দেখা যায় আকস্মিক বিপর্যয়ের মতো। কিন্তু রাজনীতি সচরাচর আকস্মিক বিপর্যয়ে কাজ করে না। বরং তা ধীরে ধীরে জমা হয়, জেগে উঠে, তারপর নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গ আগেও এমন গল্প দেখেছে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার চাপে কংগ্রেসের পতন ঘটে। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। সেই পরিবর্তনগুলোকে যুগান্তকারী মোড় হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি পরিবর্তনই ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা ক্ষয়প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি। ২০২৬ সালে বিজেপির জয় সম্পূর্ণভাবে সেই ধারার মধ্যেই পড়ে। এখানে কোনো জাদু নেই, শুধু সময়ের সঞ্চিত ক্ষোভের গতিবেগ চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছেছে। বাংলার প্রশাসন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল একক নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে ভোটাররা, বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও তরুণ সমাজ তাদের আশা-আকাক্সক্ষা, পুনরায় যাচাই করা শুরু করে। একসময়ের কৃতজ্ঞতা বদলে গিয়ে পরিণত হয় হতাশায়। শুধু বিদ্বেষমূলক ভোটই ২০০-এর বেশি আসনে প্রতিপক্ষকে জয় এনে দিতে পারে না। এর গভীরে আরও কোনো পরিবর্তন হয়েছিল। বিজেপি নির্বাচনী অঙ্ক নিজেই নতুন করে সাজাতে সক্ষম হয়েছে। অমিত শাহের কৌশলগত নির্দেশনা এবং নরেন্দ্র মোদির বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে দলটি, অত্যন্ত কার্যকর খেলার কৌশল প্রয়োগ করে। নিজস্ব ভোটব্যাংককে সংহত এবং অন্যকে ভেঙে দেওয়া সহজ কৌশল নয়।

ভারতীয় রাজনীতিতে এটি নতুন কিছু নয়, কিন্তু বাংলায় তা গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নিজেকে গর্বিত করত। বিশেষ করে, প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ প্রতিরোধ করার জন্য। সেই প্রতিরোধ এখন দুর্বল হয়েছে। বিজেপি শুধু একটি জাতীয় বয়ান আমদানি করেনি, বরং একে স্থানীয় রূপ দিয়েছে। তারা পরিচিত রাজনীতির সঙ্গে, কল্যাণের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে। তৃণমূলের সামাজিক কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করে, বড় আকারের নগদ স্থানান্তর ও উন্নয়নের অঙ্গীকার দিয়েছে। এর মাধ্যমে আদর্শিক সংহতি এবং বাস্তব প্রণোদনার মধ্যে রেখা অস্পষ্ট করে দিয়েছে তারা। দলটির কৌশলগত শৃঙ্খলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি এবার কৌশল বদলায়। ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষের বদলে তারা, প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকে নজর দেয়। স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনে, বুথ-স্তরের সংগঠনে ব্যাপক বিনিয়োগ করে এবং ১৭৭টি জয়-উপযোগী কেন্দ্রকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করে। এমনকি তাদের সাংস্কৃতিক বার্তাটিকেও পরিমার্জিত করা হয়। এই ফলাফল নিছক রাজ্যস্তরের জয় নয়, এটি ভারতের রাজনৈতিক ভূগোলে কাঠামোগত পরিবর্তন। পশ্চিমবঙ্গ ছিল বিজেপি প্রসারের বিরোধিতা করা, বড় ঘাঁটিগুলোর একটি। এর পতন আসাম, ত্রিপুরা ও ওড়িশায় অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে মিলে পূর্ব ভারতে দলটির একত্রীকরণ সম্পূর্ণ করে। এর প্রভাব কলকাতার বাইরে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য মাত্র নয়; এটি ভারতের বাংলাদেশ প্রবেশদ্বার। দেশটির সঙ্গে এর দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করে।

তৃণমূল শাসনের অধীনে অভিবাসন, নাগরিকত্ব আইন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে রাজ্য সরকার ও নয়াদিল্লির মধ্যে প্রায়ই এক সূক্ষ্ম টানাপড়েন ছিল। সেই টানাপড়েন, কোনো না কোনোভাবে ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করত। কেন্দ্রের সঙ্গে সারিবদ্ধ বিজেপি সরকার সম্ভবত সেই প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে দেবে। প্রথম ও সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়টি হলো, অভিবাসন। বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের বয়ানটি বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে জোর দিয়ে বলে আসছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং প্রস্তাবিত নাগরিকপঞ্জির মতো নীতিগুলো এই বয়ানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার যদি কেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একমত হয়, তাহলে তা কঠোর আইন প্রয়োগের পথ সুগম করতে পারে। ঢাকার জন্য এটি কূটনৈতিক ও মানবিক উভয় ধরনের উদ্বেগ বাড়াবে।  দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চোরাচালান, পাচার এবং সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়তে পারে। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ মিলে যায়। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই সামাজিক মূল্য নিয়ে আসে। সীমান্তের জনপদগুলো, যারা ইতিমধ্যেই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বাস করে, নিরাপত্তা জোরদার করার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্পর্কটি এক বিপরীতমুখী পরিস্থিতি  তৈরি করে। একদিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার যোগাযোগের প্রকল্পগুলো দ্রুত করতে পারে, যা দুই অর্থনীতির জন্যই লাভজনক।

বাণিজ্য চলে স্থিতিশীলতার ওপরে ভর করে। রাজনীতি প্রায়ই তাকে বিঘিœত করে। তবে এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ভুল হবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, গত এক দশক ধরে নিরাপত্তা সমন্বয়, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক সংযোগের বাস্তবসম্মত সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই কাঠামোগত উপাদানগুলো একদিনে উধাও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং আরও সমন্বিত ভারতীয় রাজনৈতিক কাঠামো,  যা পরিকাঠামো ও বাণিজ্য সংক্রান্ত উদ্যোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করে দিতে পারে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো, বিপরীতমুখী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। একটি সম্পর্ক যা অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, তা যতœসহকারে পরিচালনা জরুরি। বাংলাদেশকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে, পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ফলাফল গঠনে রাজ্য-স্তরের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে স্বীকার করে নিতে হবে। নির্বাচনী সাফল্য বাড়তি প্রত্যাশা বয়ে আনে। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের নিজস্ব একটি ধারা আছে যা বিজয়ীদের বিনীত করে। শেষ পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গ একটি বড় রাজনৈতিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয় কোনো আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়, কোনো জোট অটল নয়। ভোটারদের মন বদলায়, বয়ান বদলায় আর ক্ষমতা হাতবদল হয়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান, আগামীতে সম্পৃক্ততার পরিসীমা নির্ধারণ করবে। ইতিহাস কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হয় না। বরং তা শুধু পাতা উল্টায়।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

writemah71@gmail.com