মার্জার ও অ্যাকুইজিশন উন্নত বিশ্বের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় ব্যবসায়িক সুযোগ হলেও, আমাদের দেশে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের ব্যাংকিং খাতে একাধিক ব্যাংক একীভূত করার বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে বিগত কয়েক বছর ধরে। দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হয়ে যাওয়া, বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় একাধিক ব্যাংকের একীভূত হওয়ার বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ব্যাংক মার্জারের পক্ষে-বিপক্ষে, উভয় দিক নিয়েই আলোচনা হয়েছে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও, ব্যাংক মার্জারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক মার্জারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, বাংলাদেশ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘সম্প্রতি পুনঃতফসিল করা বিপুল পরিমাণ ঋণে দুই বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হলো, এ সময়ে ব্যাংকগুলো ঋণ থেকে কোনো আয় করতে পারবে না।’ তিনি এও বলেছেন, ‘কিছু ব্যাংকের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।’ এই প্রেক্ষাপটে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে এই বিশ্লেষণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আইএমএফে (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং একজন বিশিষ্ট মুদ্রাবাজার বিশেষজ্ঞ হিসেবেও পরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাত এবং মুদ্রাবাজার নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলেছেন। কিন্তু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব পেয়ে করেছেন উল্টো কাজ। অতি উৎসাহী হয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা কয়েকটি ব্যাংক মার্জারের সিদ্ধান্ত তিনি কার্যকর করেন। ব্যাংক মার্জারের নামে তিনি যা করেছেন, তাতে না হয়েছে প্রকৃত ব্যাংক মার্জার, না ব্যাংকগুলোকে খারাপ অবস্থা থেকে উদ্ধার করা গেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের মালিক পক্ষ এক ধরনের সমস্যার মধ্যে আছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক আরেক ধরনের সমস্যার মধ্যে আছে। আর গ্রাহকরা আছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। ব্যাংক মার্জার এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিরামহীন আলোচনা চলতে পারে। তাই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করে কোনো পক্ষকে সম্মত করানোর চেষ্টা এক ধরণের বৃথা প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে যারা ব্যাংক মার্জারের পক্ষে কথা বলেন এবং বাংলাদেশে একাধিক ব্যাংকের মার্জারের পক্ষে সম্মতি প্রকাশ করেন, তাদের আলোচনার সুবিধার্থে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ব্যাংক মার্জার উদ্যোগের কথা তুলে ধরছি। ২০০৮ সালে আমেরিকায় সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির কারণে যখন আর্থিক খাতে ধস নেমেছিল, তখন ছোট-বড় অনেক ব্যাংক মারাত্মক অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। অনেক ব্যাংক বন্ধ বা দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তৎকালীন সরকার প্রথমদিকে একাধিক ব্যাংক মার্জ বা একীভূত করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কয়েকটি ব্যাংকের মধ্যে মার্জার সংঘটিতও হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিটি ব্যাংক যখন একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলো, তখন আমেরিকার সরকার বুঝতে পারল যে, মার্জার এবং অ্যাকুইজিশনের মাধ্যমে ব্যাংক টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তৎকালীন ওবামা সরকার ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেইল-আউট প্যাকেজের মাধ্যমে আমেরিকার আর্থিক খাত, বিশেষ করে সংকটে পড়া ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করেছিল।
২০২৩ সালে আমেরিকার ব্যাংকিং খাত পুনরায় সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং রাতারাতি সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ধসে পড়ে এবং এর প্রভাবে আরও কিছু ছোট ও আঞ্চলিক ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সেই সংকটেও একাধিক ব্যাংক মার্জারের পথে না হেঁটে বিকল্প পদ্ধতিতে সমস্যায় থাকা ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করা হয়েছে। সেই সময় ইউরোপেও কিছু ব্যাংক সমস্যায় পড়ে। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক, ক্রেডিট সুইজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল। সেই প্রতিষ্ঠানও ২০২৩ সালে মারাত্মক সমস্যায় পড়ে ধসে পড়ার উপক্রম হয়। বিষয়টি সুইজারল্যান্ডের তো বটেই, পুরো ইউরোপের আত্মসম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কিছুটা নিরুপায় হয়ে সুইজারল্যান্ড সরকার ক্রেডিট সুইজ উদ্ধারে এগিয়ে আসে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে সুইজারল্যান্ডেরই আরেকটি বৃহৎ ব্যাংক ইউবিএসের সঙ্গে মার্জ করে ক্রেডিট সুইজকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। ইউবিএস যেহেতু বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তাই তারা এই মার্জার করার ধকল সামাল দিতে পারলেও ইউবিএস এখনো সেই আগের অবস্থানে আসতে পারেনি। এই অভিজ্ঞতার কারণেই সুইজারল্যান্ডে যখন আরও একটি ব্যাংক অনুরূপ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল, তখন সেই ব্যাংককে আর মার্জারের মাধ্যমে উদ্ধারের চেষ্টা না করে বিকল্প পন্থায় রক্ষা করা হয়েছিল।
জার্মানির ডায়েচ ব্যাংক ছিল বিশ্বের অন্যতম এক বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বেশ কয়েক বছর আগে অনিয়মের অভিযোগে আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এই ডায়েচ ব্যাংককে বিশাল অংকের জরিমানা করে। এই জরিমানার পরিমাণ এতই বিশাল ছিল যে এর ভার সইতে না পেরে এক সময়ের বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাংক মারাত্মক সংকটে পড়ে যায় এবং একপর্যায় এর অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হয়। তখন ডায়েচ ব্যাংককে রক্ষার উদ্দেশ্যে জার্মানির আরেক বৃহত্তম ব্যাংক কমার্স ব্যাংকের সঙ্গে মার্জারের সিদ্ধান্ত হয় এবং এই দুই ব্যাংক একীভূত হওয়ার উদ্যোগ অনেকটা এগিয়েছিল। একপর্যায় এই দুই ব্যাংকের মার্জার সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মার্জারের মাধ্যমে ব্যাংকের সমস্যা দূর করা সম্ভব হয় না এবং ব্যাংক মার্জারের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল খুব একটা ভালো হয় না জন্য জার্মান সরকার এই দুই ব্যাংকের মার্জারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
স্পেনের ব্যাংক বিবিভিএ (ব্যাংকো বিলবাও ভিজক্যায়া আর্জেন্টারিয়া) বিশ্বের অন্যতম একটি বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। প্রায় দুই বছর আগে স্পেনেরই আরেকটি ব্যাংক, ব্যাংকো ডি সাবাডেলের সঙ্গে এই বিবিভিএর মার্জারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল। এই মার্জার ছিল মূলত লাভজনক ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় ধরে আলোচনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্মতি নিয়ে কথাবার্তা চললেও, এই দুই ব্যাংকের মার্জার আজও কার্যকর হয়নি। বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে ইতালির অন্যতম আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনি-ক্রেডিট এবং জার্মানির আর্থিক প্রতিষ্ঠান কমার্স ব্যাংকের মধ্যে মার্জারের আলোচনা চললেও সেই মার্জার আজও সম্পন্ন হতে পারেনি। এই দুই ব্যাংকের মার্জারও লাভজনক ব্যবসায়িক কৌশল। মূলত ইতালির ইউনি-ক্রেডিট জার্মানির কমার্স ব্যাংককে তাদের ব্যাংকিং ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে গেলেও জার্মানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই দুই ব্যাংকের মার্জারের সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতে রাজি হয়নি। কিন্তু ইউনি-ক্রেডিটও তাদের কৌশল থেকে সরতে নারাজ। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ইউনি-ক্রেডিট জার্মানির কমার্স ব্যাংকের শেয়ার মালিকানা ক্রয় করে তারা এই ব্যাংকে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং এই লক্ষ্যে তারা ইতোমধ্যে ত্রিশ শতাংশের বেশি মালিকানা কিনে ফেলেছে। কমার্স ব্যাংকে ইউনি-ক্রেডিটের মালিকানা ৪২.৫%-এ উন্নীত করতে পারলেই, কমার্স ব্যাংকে ইউনি-ক্রেডিটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে এবং তখন আনুষ্ঠানিক মার্জার সম্পন্ন না করেও ইউনি-ক্রেডিটের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য অর্জিত হবে।
অনেকেই ভাবতে পারেন, ব্যাংক মার্জারের বিষয়ে যেসব দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছি তার সবই উন্নত বিশ্বের ঘটনা। খুবই স্বাভাবিক। উন্নত বিশ্বে যেখানে সকাল-বিকাল বিভিন্ন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মার্জার এবং অ্যাকুইজিশনের ঘটনা ঘটে, সেখানেই ব্যাংক মার্জার সেভাবে কাজ করেনি এবং ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানে কোনো রকম ভূমিকা রাখেনি। আর উন্নয়নশীল বিশ্বে যেখানে মার্জার এবং অ্যাকুইজিশনের প্রচলন নেই বললেই চলে, সেখানে ব্যাংক মার্জার একেবারেই কাজ করবে না। আর এ কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বে ব্যাংক মার্জারের ঘটনা খুব একটা শোনা যায় না। ভারতে ছোট মাপের দু-একটি ব্যাংক মার্জারের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলো সংবাদ হবার মতো ঘটনা নিশ্চয়ই নয়। ব্যাংক মার্জার যে এ খাতের সমস্যা সমাধানের মাধ্যম নয়, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। আর এ কারণেই মার্জার ও অ্যাকুজিশনের স্বর্গরাজ্য বলে খ্যাত উন্নত বিশ্বেও ব্যাংক মার্জারের ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না এবং ব্যাংক মার্জারকে প্রকারান্তরে নিরুৎসাহিত করা হয়। আমাদেরও ব্যাংক মার্জারের চিন্তা-ভাবনা থেকে সরে আসা উচিত। ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধান করতে হবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প পদ্ধতিতে। আজ হোক, আর কাল হোক, আমদের দেশের ব্যাংকিং খাতকে এ পথেই হাঁটতে হবে। নীতিনিষ্ঠ, কর্মদক্ষদের নিয়োগ দিয়ে গ্রহণযোগ্য বিকল্প পন্থা অবলম্বন করে এ খাতের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। সংকট নিরসন এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সবার আগে দরকার খাতটিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন, নীতিমালা পরিবর্তন তো বটেই, আবশ্যক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
লেখক : সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকার, টরেন্টো, কানাডা
