রাতের নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ গর্জে ওঠা পিস্তল, জনাকীর্ণ মোড়ে চাপাতির তীব্র ঝলকানি আর ফুটপাতে পড়ে থাকা নিথর দেহের চারপাশে রক্তের নহর এমন দৃশ্য কোনো ক্রাইম থ্রিলারের গল্প নয়। এটি আমাদের চিরচেনা জনপদের বর্তমান বীভৎস বাস্তবতা। যখন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজপথ সাধারণ মানুষের নিরাপদ পদচারণার বদলে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘টার্গেট কিলিং’-এর কসাইখানায় পরিণত হয়, তখন বুঝতে হবে অন্ধকারের অশুভ শক্তি আমাদের শাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কড়া নাড়ছে। এক অদৃশ্য গডফাদারের ইশারায় দাবার গুটির মতো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, রাজপথ যেখানে মানুষের জীবনের মূল্য কেবল প্রবাসে বসে থাকা খুনিদের দরাদরি আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ডিজিটে সীমাবদ্ধ। আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্রের ঝনঝনানি আর রিমোট কন্ট্রোলে নিয়ন্ত্রিত এই ‘রক্তের হোলিখেলা’ কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং একটি সভ্য সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সুগভীর ব্লু-প্রিন্ট। টার্গেট কিলিংয়ের এই বিষাক্ত ছোবল জননিরাপত্তাকে আজ এমন খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে ফেরার পথ ক্রমে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই মরণকামড়, আমাদের সমাজকাঠামোকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আগে সন্ত্রাসীরা সরাসরি মাঠে থাকত, এখন তারা সুদূর প্রবাসে বসে প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের কারাগার থেকে একযোগে মুক্তি পেয়েছে একঝাঁক দুর্র্ধর্ষ শীর্ষসন্ত্রাসী।
কুখ্যাত অপরাধীরা দীর্ঘ সময় পর মুক্ত পৃথিবীতে বেরিয়ে আসায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমীকরণ রাতারাতি বদলে গেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী এখনো তাদের পূর্ণ শক্তি ও মনোবল ফিরে পায়নি এই চরম দুর্বলতাকে মোক্ষম সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রকরা। অস্তিত্ব জাহির করা এবং হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের নেশায় তারা এতটাই মরিয়া যে, খোদ আপনজনও রেহাই পাচ্ছে না তাদের জিঘাংসা থেকে। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, অধিকাংশ শীর্ষসন্ত্রাসী বিদেশের মাটিতে পাড়ি দিলেও তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে দেশের ভেতরের টেন্ডারবাজি, দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। টার্গেট কিলিংয়ের এই ভয়াবহ রূপ সম্প্রতি দেখা গেছে, ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায়। গত মঙ্গলবার রাতে অপরাধ জগতের ত্রাস খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খুন হন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই খুনের নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযোগের আঙুল উঠেছে তার আপন ভগ্নিপতি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক ত্রাস সানজিদুল ইসলাম ইমনের দিকে। কারাগার থেকে মুক্তির পর ইমন মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমালেও তার ইশারায় হাজারীবাগ, ধানম-ি ও মোহাম্মদপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শ্যালক টিটনের সঙ্গে বিরোধ চরমে ওঠে। ইমনের পুরনো সহযোগী কিলার বাদল ও পিচ্চি হেলালের সঙ্গে টিটনের দীর্ঘদিনের শত্রুতা ছিল। পুলিশের ধারণা, এই ত্রিমুখী বিরোধের জেরেই প্রাণ দিতে হয়েছে টিটনকে। এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে যে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে এখন কোনো পারিবারিক বা নৈতিক বন্ধন অবশিষ্ট নেই; সেখানে কেবল ‘পাওয়ার’ আর টাকাই শেষ কথা।
সম্প্রতি দেশের অপরাধ জগতের মানচিত্র পাল্টে দিয়েছে, মোহাম্মদপুরের ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। এক সময় যা ছিল কেবল উঠতি বয়সীদের ছোটখাটো বিবাদ, তা এখন পরিণত হয়েছে নৃশংস ‘কিলিং মেশিনে’। মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান, নবোদয় হাউজিং এবং জেনেভা ক্যাম্পের মতো এলাকাগুলো কার্যত অপরাধীদের অভয়ারণ্য। প্রকাশ্য দিবালোকে রামদা আর চাপাতি নিয়ে টার্গেট করে কুপিয়ে হত্যা করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে বন্দুকযুদ্ধ প্রায়ই চলে, সেখানে প্রাণ হারায় সাধারণ মানুষও। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদাররা কিশোরদের ব্যবহার করছে খুনের মিশনে, কারণ তারা জানে কিশোর অপরাধীদের আইনি মারপ্যাঁচে ধরা বা সাজা দেওয়া সহজ নয়। এই কিশোররা কেবল অস্ত্রবাজিই করছে না, বরং তারা শীর্ষসন্ত্রাসীদের ‘ফুট সোলজার’ হিসেবে কাজ করছে। মোহাম্মদপুরের এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে রাষ্ট্র যখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপরাধী গোষ্ঠীও এক সময় দানব হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে রাজধানীর মানচিত্র যেন সন্ত্রাসীদের মাঝে ভাগ করা একেকটি ছোট সাম্রাজ্য। মিরপুর, ইব্রাহিমপুর ও কচুক্ষেত এলাকার দখল নিয়েছে পরিচিত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা। তারা ঠিকাদারদের জিম্মি করে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে এবং নিজেদের সিন্ডিকেটের কাছ থেকে চড়া দামে নির্মাণসামগ্রী কিনতে বাধ্য করছে। এদিকে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে, পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে তার অনুসারীদের দিয়ে খুনের মিশন পরিচালনা করছে। গত বছর আকবর ও সারওয়ার নামের দুই সন্ত্রাসীর হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, চট্টগ্রামে আধিপত্যের এই লড়াই কতটা রক্তক্ষয়ী। এমনকি মোল্লা মাসুদ বা সুব্রত বাইনের মতো সন্ত্রাসীরা কারাগারে থাকলেও, তাদের একটি চিরকুট বা গোপন বার্তার মাধ্যমেই এলাকা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই ‘রিমোট কন্ট্রোল সন্ত্রাস’ বা ‘টার্গেট কিলিং’ সমাজকে এক ভয়ের চাদরে ঢেকে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা, সময়ের দাবি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা কি তবে কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতা দমন বা সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধে সীমাবদ্ধ? যখন প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ রাস্তায় টার্গেট কিলিং চলে, তখন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, জেল থেকে শীর্ষসন্ত্রাসীরা মুক্তি পাওয়ার পর আবার অপরাধ জগতে ফিরে যায়। তারপর তারা পুনরায় রক্তের হোলিখেলায় মেতে ওঠে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের মুক্তির দায়ভার নেবে কে?
প্রথমত, এমন অন্ধকার গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য, কেবল গালভরা বুলি নয় সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, অপরাধ জগৎকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। কোনো সন্ত্রাসী বা গডফাদারের পরিচয় ‘রাজনীতিক’ হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, রাজধানীসহ দেশের কিশোর গ্যাংগুলোর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে হবে। কেবল গ্রেপ্তার নয়, বরং এদের পেছনের অর্থদাতা ও আশ্রয়দাতা বড় ভাইদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, বিদেশের মাটিতে বসে যারা টার্গেট কিলিং নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি এবং কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। জেল থেকে মুক্ত হওয়া শীর্ষসন্ত্রাসীদের গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং তাদের আয়ের উৎসগুলো বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ডিজিটাল ইন্টেলিজেন্সে আরও দক্ষ হতে হবে, যাতে টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনা হওয়ার আগেই তা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা দূর করা জরুরি। একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার যদি ২০ বছর ধরে চলে, তবে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠবেই। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই ধরনের খুনের বিচার ছয় মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। জনমনে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, অপরাধী যত বড় গডফাদারই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। যখন রাষ্ট্র নিজেই ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন হবে, তখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের কালো ছায়া এমনিতে মিলিয়ে যাবে। সীমান্তে ড্রোন নজরদারি এবং ডিজিটাল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ রোধ করা এখন সময়ের দাবি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইতিমধ্যে জেলা পর্যায়ে বিশেষ বার্তা পাঠানো হলেও, এর বাস্তবায়ন মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হতে হবে। কারাগার কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে জেলখানা কোনোভাবেই অপরাধীদের ‘কমান্ড সেন্টার’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে।
রক্তাক্ত জনপদ কোনো জাতির কাম্য হতে পারে না। টার্গেট কিলিং এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইশারা যখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন বুঝে নিতে হবে আমাদের অস্তিত্ব গভীর সংকটের মধ্যে। অস্ত্রের ঝনঝনানি আর রক্তের খেলা বন্ধ না হলে, উন্নয়ন কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ থাকবে। ২০২৪-এর পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে মানুষ যে নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা যেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাতে জিম্মি না হয়। গডফাদারদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা আজ রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো মায়ের বুক গুলির শব্দে কাঁপবে না, যেখানে রাজপথ রক্তের রঙে লাল হবে না। অপরাধীদের শিকড় উপড়ে ফেলে অন্ধকারের এই সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশিয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, রক্ত দিয়ে রক্ত ধোয়া যায় না, কিন্তু দ্রুত ও কঠোর ন্যায়বিচারের মাধ্যমে অপরাধের বীজ উপড়ে ফেলা সম্ভব। অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক, সূর্যোদয় অবধারিত। সেই নতুন ভোরের অপেক্ষায় পুরো জাতি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের পতন ঘটিয়ে রাজপথে শান্তির শ্বেতকপোত উড়িয়ে দেওয়ার শপথ নিতে হবে। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় উত্তরসূরিদের কাছে সবাই অপরাধী হয়ে থাকব। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোতে নয়, উন্নয়ন মানুষের জীবনের নিরাপত্তায়।
লেখক: সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড
antora00111@gmail.com