বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোচিত বালিশকা-ের অডিট রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন ‘একটা বালিশ জাদুঘরে রাখা উচিত।’ উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ১৬ মে ‘কেনা-তোলায় এত ঝাঁজ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে রূপপুর প্রকল্পের দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যা ‘বালিশকান্ড’ নামে দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি পায়। গত মঙ্গলবার মহা হিসাবরক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) ৩৮টি অডিট রিপোর্টের মধ্যে রূপপুর দুর্নীতির রিপোর্টও ছিল। ওই রিপোর্ট পেশ করার পর প্রতিটি বালিশের এ রকম অবিশ্বাস্য দাম জেনে সিএজিকে কথার ছলে প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘এই দামি বালিশের একটি জাদুঘরে রাখা উচিত’। দুর্নীতি কোন স্তরে নেমে গেলে, একটি বালিশ ২০তলা ভবনে তুলতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। কেনাকাটার অন্যান্য সামগ্রীর বর্ণনা দিলে চমকে উঠবে সবাই। এই রিপোর্ট দেশ রূপান্তর প্রকাশ করার সুবাদে জনসমক্ষে উঠে এলো দুর্নীতির মহাকান্ডটি। প্রকল্পের আবাসিক ভবনের জন্য ১৬৯ কোটি টাকার কেনাকাটায় ‘পদে পদে’ দুর্নীতি হয়েছে। একটি বালিশ কেনার পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে, ৬ হাজার ৭১৭ টাকা। এর মধ্যে প্রতিটি বালিশের দাম দেখানো হয় ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। সেই বালিশ ফ্ল্যাটে ওঠানোর খরচও ৭৬০ টাকা দেখানো হয়। এই অবিশ্বাস ঘটনা আমাদের মতো সবাইকে হতবাক করে, কিন্তু তৎকালীন সরকার থাকে নির্বিকার।
জানা গেছে, ওই প্রকল্পের মহা দুর্নীতির পেছনে ছিলেন ক্ষমতাসীনদের শীর্ষস্তরের লোক, যারা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি করে দেওয়ার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্নী ও ভাগ্নে ৫৯ মিলিয়ন ডলার কমিশন নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে ছবিতেও দেখা যায় তাদের । ফলে দুর্নীতির বিষয়টি মুখরোচক আলোচনায় পরিণত হয়। শুধু একটিমাত্র দুর্নীতি দেখলেই অনুমান করা যায়, ওই সময়ে কত শত প্রকল্পে দুর্বৃত্তায়নের ঘটনা ঘটেছে। বালিশকান্ডের বাইরে পর্দাকান্ড, বইকান্ড, টিনকান্ড, ইভিএমকান্ড প্রভৃতি জনগণের মুখে মুখে ফিরেছে। কেনাকাটায় একের পর এক এমনই দুর্নীতি চলেছে আওয়ামী সরকারের আমলে। দেশকে ওই সরকার আমদানিনির্ভর করে তুলেছে, যার কাফফারা দিতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে।
সত্য সব সময়ই নির্মম। তাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না। হয়তো সাময়িকভাবে অলক্ষ্যে রাখা যায়। কিন্তু শেষাবধি ধরা পড়তেই হয়। আমাদের সমাজ-সংসার থেকে দুর্নীতিকে উচ্ছেদ করা যায়নি। বিশেষ করে, প্রশাসনের ভেতরে তাদের প্রায় স্থায়ী একটি সিন্ডিকেট এখনো সচল। আছে কাস্টমস, ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খাদ্যের নানা কাজে দুর্নীতি। পুলিশের দুর্নীতি, রোড ও হাইওয়েতে কাঁচা বাজার ও পাকা বাজারে সিন্ডিকেট দুর্নীতির অন্তর্গত রূপ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কথাচ্ছলে বালিশ জাদুঘরে রাখার কথা বললেও, তিনি সত্য উচ্চারণ করেছেন। জাদুঘরে বালিশ যাবে না কোনো দিন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এসব দুর্নীতি ও অপরাধের নির্মম চিহ্ন থেকে যাবে। সংরক্ষিত হবে চলমান ইতিহাসের পাতায়। আমরা চাই না, আর কোনো বালিশকান্ড ঘটুক। চাই দেশটি গণতান্ত্রিক শুভ্রতায় এগিয়ে যাক। আমাদের লক্ষ্য একটি সুশাসনভিত্তিক ন্যায় সমাজ, যেখানে দুর্নীতি যাবে জাদুঘরে।