কওমি তরুণদের অনেকেই নানা কারণে ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশাগ্রস্ত। কেউ কেউ ছোটাছুটি করছেন দিকভ্রান্ত পথিকের মতো। তাদের হতাশা ও দিকভ্রান্তির জায়গাটা কি আসলেই যৌক্তিক? কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস সংস্কারসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন কেরানীগঞ্জের জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়ার অধ্যক্ষ মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বেলায়েত হুসাইন
দেশ রূপান্তর : বর্তমানে কওমি মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করা তরুণদের একটি অংশ ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশ। আপনার দৃষ্টিতে এই হতাশার কারণ কী এবং এটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ : কওমি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা সমাপনকারী তরুণদের অনেকের ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশার বিষয় আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক ও গভীর ভাবনার দাবি রাখে। এ ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার যারা অভিভাবক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছেন তাদের অনিবার্য কর্তব্য হলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মহলের সুচিন্তিত মতামত গ্রহণ করা এবং নিজেদের মধ্যে গভীর আলাপ-আলোচনা করে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
অবশ্য কওমি মাদ্রাসা পড়ুয়াদের মধ্যে যারা ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করছেন এবং এ নিয়ে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারণী কর্র্তৃপক্ষকে দুষছেন, তাদের অনেকের বক্তব্যে যে ভাষা, যুক্তি, মতামত ও মন্তব্য প্রয়োগ ও উপস্থাপন করছেন তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে জান্নাতবাসী হওয়ার ঐকান্তিক ইচ্ছা নিয়ে লেখাপড়া শেষ করে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করা অযৌক্তিক ও বোকামি বৈ কিছু নয়।
কওমি মাদ্রাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে তাদের এই হতাশা ও অভিযোগের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ কওমি মাদ্রাসায় কেবল ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য আল্লাহর বিধিবিধান জানা, তা অনুযায়ী নিজে আমল করা এবং অন্যদেরকে আমলের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে আল্লাহর পরম সন্তুষ্টি অর্জন করা। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কারিকুলাম ও সিলেবাসের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ সৃষ্টি, নৈতিক চরিত্রে উৎকর্ষ সাধন এবং আদর্শ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। বিভিন্ন পেশায় যোগ্য ও দক্ষ করে পার্থিব অর্থ উপার্জন, বৈষয়িক চাকরি-বাকরির জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা এ সিলেবাসের লক্ষ্য নয়।
দেশ রূপান্তর : এই হতাশার পেছনে মূল কারণ কি কর্মসংস্থানের সংকট, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কম, সামাজিক মূল্যায়নের ঘাটতি, নাকি অন্য কিছু?
মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ : বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সংকট দীর্ঘদিনের। কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। দিন দিন বেকারত্ব বেড়েই চলছে। সেখানে স্বভাবতই ‘কর্মহীন নিছক ধর্ম শিক্ষা’য় শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। এতে হতাশ হওয়ার কী আছে? আর মসজিদ-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইমামতি, মুয়াজ্জিনি, শিক্ষকতা ইত্যাদি যে সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষতদের রয়েছে, তাতে বেতন-ভাতা বর্তমানে কিছুটা চলনসই হলেও বিগত অনেক বছর খুব সামান্য ছিল, তা সবার জানা। অতএব বেতন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা হতাশার কারণ হতে পারে না। ইলম ও আমলে পরিপূর্ণ যেকোনো আলেমের সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান এখনো স্বীকৃত। যোগ্যতাসম্পন্ন মুত্তাকি আলেমদের সমাজে মূল্যায়ন রয়েছে। তারা পরম শ্রদ্ধেয় ও শিরোধার্য। অতএব সামজিক মূল্যায়নের ঘাটতি তরুণ আলেমদের হতাশার কারণ হতে পারে না।
বস্তুত হতাশার মূল কারণ নিজেদের হীনম্মন্যতা, সংকীর্ণতা, অজ্ঞতা ও অযোগ্যতা এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা না নিয়ে এ ধারায় শিক্ষা লাভ করা। কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষা অর্জন করে যারা জাগতিক কোনো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে চায় তারা মূলত অর্জুন বৃক্ষরোপণ করে হিমসাগর আম অথবা গোলাপ গাছ রোপণ করে পটল ফলানের অবাস্তব আশা করেন।
দেশ রূপান্তর : কওমি শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলাম বা শিক্ষাসিলেবাসে এমন কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কী, যা শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও সমসাময়িক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে বাধা তৈরি করছে?
মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ : কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কারিকুলাম ও কওমি শিক্ষা সিলেবাস ব্রিটিশ শাসিত ভারত উপমহাদেশের এক ক্রান্তিকালে শুধু ধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ তৈরির উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল। অতএব এতে সীমাবদ্ধতা সুনিশ্চিত এবং এ ধারায় শিক্ষা অর্জন করলে সমসাময়িক আধুনিক বা অন্য যেকোনো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের উপযুক্ত না হওয়া অতি স্বাভাবিক বিষয়। তবুও এ ধারায় শিক্ষা অর্জন করে যারা জাগতিক কোনো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পেরেছেন, তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে অর্জিত যোগ্যতায় তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। এতে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। যেমন কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি অনেকেই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা আলিয়া মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে থাকেন। আবার অনেকে বিশেষ কোনো কোর্স সম্পন্ন করে কওমি কেন্দ্রিক কর্মক্ষেত্রের নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে কোথাও কোনো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
দেশ রূপান্তর : অনেকেই মনে করেন, কওমি শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কিছু পেশার (ইমামতি, খতিব, শিক্ষকতা) মধ্যে সীমাবদ্ধ, এই ধারণা কতটা সঠিক? আবার বাস্তবতা হলো, কওমি সিলেবাসে পড়ে এর বাইরে কোনো পেশাতে কাজ করার তেমন একটা দক্ষতাও হয় না, এর সমাধান কী?
মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ : কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্র সীমিত ও সীমাবদ্ধ। এটা ধারণা নয়, বরং বাস্তবতা। যেহেতু শিক্ষার্থীদের প্রাচীন ও আধুনিক কোনো ধরনের জাগতিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার যোগ্যতা অর্জন করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে কওমি শিক্ষা কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়নি, তাই কারও যদি এ ধারায় শিক্ষা অর্জন করার পরও এর নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে কোনো পেশায় দক্ষতা অর্জন না হয় তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর সমাধান সহজ, যারা জাগতিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে চান বা ধনসম্পদ অর্জন করতে চান তারা জাগতিক শিক্ষা অর্জন করবেন। কওমি মাদ্রাসায় কেবল তারাই পড়াশোনা করবেন যারা আল্লাহর পরম সন্তুষ্টি অর্জন করে পরকালের জীবনে সম্মান ও মর্যাদার আসনে সমাসীন হওয়ার মহতি লক্ষ্যে দ্বীনের দাঈ ও বিশেষজ্ঞ আলেম হতে চান।
দেশ রূপান্তর : আপনার মতে কওমি তরুণদের জন্য বিকল্প ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে কী ধরনের দক্ষতা বা প্রশিক্ষণ যুক্ত করা প্রয়োজন? কওমি সিলেবাস কি আরও আধুনিক ও কর্মমুখী করার সুযোগ আছে?
মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ : আমরা মনে করি, দেশের সব শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলামের সার্বজনীন ও সমন্বিত শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করা উচিত। যাতে ধর্ম ও জাগতিক উভয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কারণ, মানবজীবন দুটি পর্বে বিভক্ত। ইহকাল ও পরকাল। শিক্ষানীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্বাচনে এর স্পষ্ট প্রতিফলন আবশ্যক। অন্যথায় তা হবে অপূর্ণাঙ্গ ও খণ্ডিত। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা জীবনোপযোগী হতে পারে না। কেননা, শিক্ষা ও মানবজীবন অতি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এ দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
আর ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চলে দ্বীন রক্ষায় দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পর কাসিম নানুতুবি (রহ.) যেই শিক্ষা সিলেবাস সর্বোচ্চ ৫০ বছরের জন্য প্রণয়ন করেছিলেন, তা স্বাধীনতার পরও প্রায় দেড়শ বছর অপরিবর্তিত রয়েছে। ভারত-পাকিস্তানে এর বেশকিছু পরিবর্তন হলেও আমাদের বাংলাদেশে তা অপরিবর্তিত রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহির মতো। আকাবিরদের পক্ষ থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সংস্কার, সংশোধন ও পরিবর্তনের জন্য বারবার উদাত্ত আহ্বান ও দিকনির্দেশনা থাকলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি বাস্তবিক পক্ষে যুগের চাহিদা পূরণে উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্র, আর বস্তুজগৎ ও সমাজ জীবন প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই যুগ চাহিদার আলোকে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করতে হয়।
দেশ রূপান্তর : এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ, আলেম সমাজ ও রাষ্ট্র এই তিন পক্ষের কী ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ : দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সংকট নিরসনে অনেক আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ছিল। তবুও কওমি ধারার মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ, বিশেষজ্ঞ আলেম সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কর্র্তৃপক্ষ একমত হয়ে দ্রুত নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে ভালো ফল বয়ে আনবে। আমাদের বেশ কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে।
এক. সর্বজনীন ও সমন্বিত শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করতে হবে। মাতৃভাষা বাংলা, কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৌলিক ভাষা আরবি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্বীন প্রচারের সুবিধার্থে ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় পারদর্শিতা অর্জন করার প্রতি লক্ষ্য রেখে সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে।
দুই. কওমি মাদ্রাসার সানাবিয়া আম্মাহ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রমের এসএসসি স্তরের মধ্যে সমন্বয় করে একই সঙ্গে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নিতে হবে। বাধ্যতামূলকভাবে বিভিন্ন ধারার মাদ্রাসা শিক্ষাকে একমুখী করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন করে বিভিন্ন ধারার মাদ্রাসা বন্ধ ও নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিন. এসএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিশেষজ্ঞ আলেম ও দাঈ হতে আগ্রহী প্রার্থীদের মধ্য থেকে উন্নত ফলাফল, সন্তোষজনক চারিত্রিক ও নৈতিক গুণাবলি বিবেচনায় নিয়ে বাছাই করা হবে। অন্যান্যদের তাদের পছন্দমতো সাবজেক্ট নিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে।