ঈদে মহানগরে পশুর হাটে লেনদেন হবে ব্যাংকে

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু বিক্রির অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন ব্যবসায়ীরা। এ বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৬৭৮টি হাট বসবে। ইতিমধ্যে হাট ইজারাচুক্তির কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এসব হাটে পশু কেনা-বেচায় কোটি কোটি টাকার নগদ লেনদেনে জাল টাকা ও প্রতারণার ঝুঁকিতে থাকেন ব্যাপারিরা। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এ ঝুঁকি বেশি থাকে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ঢাকাসহ পাঁচ মহানগরীর ৩০টি হাটে বসানো হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অস্থায়ী ক্যাম্প। যেখানে থাকবে থাকবে জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন, এটিএম বুথ, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও ক্যাশলেস লেনদেন সেবা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন, ব্যাংকার ও গবাদিপশুর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সাল থেকে গবাদিপশুর হাটে ডিজিটাল লেনদেন বা ব্যাংকিং সেবা চালু করে। ওইবছর ঢাকার ৬টি হাটে ছয় ব্যাংক অংশগ্রহণ করে। এ কার্যক্রমে ১৩ হাজার ২১১টি লেনদেনে পরিমাণ ছিল ৩৩ কোটি টাকা। পরের বছর ২০২৩ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১০টি হাটে ১০টি ব্যাংক অংশগ্রহণ করে। এতে লেনদেনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও লেনদেন হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নাটোরসহ মোট ১০টি হাটে ৯টি ব্যাংক অংশগ্রহণ করে। ওইবছর লেনদেন হয়েছিল ৯৭ কোটি টাকা। তবে ২০২৫ সালে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৯টি হাটে ১৪টি ব্যাংক অংশগ্রহণ করে। এতে ডিজিটাল লেনদেন হয়েছে ৪৫ হাজার ৮৯৭টি। টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ২২৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ঢাকার ২৫টি, চট্টগ্রামে দুইটি, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুরে একটি করে মোট ৩০টি হাটে ধাপে ধাপে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং পয়েন্ট অব সেল (পস) মেশিন স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে বিক্রেতারা সরাসরি ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন এবং ক্রেতারাও সহজে টাকা পরিশোধ করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির হাটে নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমাতে এবং লেনদেনকে নিরাপদ ও স্বচ্ছ করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

সিরাজগঞ্জ কামারখন্দের গরু ব্যাপারি আব্দুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই ব্যবস্থা চালু হলে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন করি। নগদ টাকা বহন করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ডিজিটাল পেমেন্ট চালু হলে আমরা অনেকটা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, হাট-বাজারে এখনো বড় অংকের লেনদেন নগদে হয়। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে। ডিজিটাল ব্যাংকিং চালু হলে অর্থ লেনদেন হবে দ্রুত, নিরাপদ এবং ট্র্যাকযোগ্য। এ ছাড়া টাকা ট্রান্সফার, ইন্সট্যান্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলনসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবার ব্যবস্থা থাকবে। এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পশুর হাটে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী ও জনবান্ধব পদক্ষেপ। দেশের অর্থনীতিকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিদের্শনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে শুধু সোনালী ব্যাংক এই সেবা দিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাই দেশের প্রতিটি বড় আর্থিক লেনদেন ধীরে ধীরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে আসুক। পশুর হাটের মতো বড় মৌসুমি বাজারগুলো এই পরিবর্তনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে ডিজিটাল ব্যাংকিং চালু হলে সাধারণ মানুষ এর সুবিধা সম্পর্কে আরও সচেতন হবে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার বাড়বে।’ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক পিএলসি সবচেয়ে বেশি তিনটি বুথ বসিয়ে গরুর হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সেবা প্রদান করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন,

প্রাথমিকভাবে ৩০টি হাটে এই কার্যক্রম চালু করা হলেও ভবিষ্যতে তা সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে কোরবানির পশুর হাটে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে পরিচালিত এই কার্যক্রমে গত চার বছরে লেনদেনের পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।