বদলি-পদায়ন নীতিমালা নিয়ে অসন্তোষ কনস্টেবল ও এসআই’র

সারা দেশে পুলিশের উপপরিদর্শক  (এসআই) ও সহকারী উপপরিদর্শকদের (এ এসআই) পদায়ন ও বদলি নিয়ে গেল বছরের ২৯ ডিসেম্বর নতুন একটি নীতিমালা জারি করে ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে, যা সংশ্লিষ্ট পদমার্যাদার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ‘বাংলাদেশ পুলিশে উপপরিদর্শক (এসআই,নিরস্ত্র), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই, নিরস্ত্র) ও কনস্টেবল পদের পদায়ন নীতিমালা-২০২৫’ প্রজ্ঞাপনটি  জারি করেন পুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশের মহাপরিদর্শক (এআইজি,পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-৩) মো. জামিরুল ইসলাম। নীতিমালার ৬ নম্বর কলামে বলা হয় ‘পুলিশ সদস্যদের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ব্যতীত নিজ জেলার মেট্রোপলিটন পুলিশে পদায়ন করা যাবে না।

বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মো. জামিরুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার কল করে তাকে পাওয়া যায়নি।

একই প্রসঙ্গে কথা বলতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এনিয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, ঢাকার বাসিন্দা আলোচ্য পদমার্যাদার পুলিশ সদস্যদের নিজ জেলার মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটে পদায়ন করা গেলে অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রে বৈষম্য কেন। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আগের আমলে পুলিশের নীতিমালা জারি করা হতো কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত। কনস্টেবল থেকে এসআই পদমার্যদার পুলিশ সদস্যদের পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে নীতিমালা জারি হলেও পরিদর্শক থেকে উচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নতুন নীতিমালার আওতায় আনা হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে কনস্টেবল থেকে এসআই পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ সদস্য বলেন, এই নীতিমালা বৈষম্যমূলক। যা বাহিনীর মধ্যে চেইন অফ কমান্ডে বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বৈষম্যের শিকার পুলিশ সদস্যরা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন। নতুন নীতিমালার আওতায় অনেকে বাধ্য হয়ে নিজ জেলায় পরিবার-পরিজন রেখে অন্য জেলায় গিয়ে চাকরি করতে হচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত একজন কনস্টেবল যিনি চট্টগ্রামের বাসিন্দা, তার প্রশ্ন আগের সরকারের নেওয়া নীতিমালা কেন বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করছে, তাছাড়া শুধু কনস্টেবল থেকে এসআই’দের পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে কেন এই নীতিমালা?

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানায়, উক্ত নীতিমালার আলোকে কনস্টেবল থেকে এসআই নিজ জেলার মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনটে চাকরি করতে পারবেন না এমন বিধান জারি করা হলেও চট্টগ্রামের বাসিন্দা সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী, উপকমিশনার শেখ সাদী, সহকারী পুলিশ কমিশনার সিরাজদৌলা, ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক পারভেজ, হালিশহর থানার ওসি কাজী মো. সুলতান আহসান উদ্দিনসহ আরও অন্তত ২০ জন পুলিশ কর্মকর্তা কর্মরত আছেন।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ দেওয়া (২০২৫ সালের ব্যাচ থেকে) নারী ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবলদের পদায়ন ও বদলি সংক্রান্ত জারি করা নীতিমালা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই নীতিমালায়  নারী পুলিশ সদস্যদের নিজ  জেলা বা পছন্দসই  জেলায় চাকরি বা পোস্টিং পাওয়ার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ওই নীতিমালায় বলা হয় যে মূলত ২০২৫ ব্যাচের নারী পুলিশ সদস্যদের নিজ জেলায় পদায়নের উদ্দেশ্য তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং কাজের ক্ষেত্র সহজতর করা।

২০২৩ ব্যাচের এক নারী কনস্টেবল উক্ত নীতিমালাকে বৈষম্যমূলক মন্তব্য করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি খুলনা জেলা পুলিশে কর্মরত আছি। আমাদেরও তো পরিবার আছে। চাকরির জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা নষ্টের জন্য এই ধরনের নীতিমালা জারি করেছেন। ফলে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ বাড়ছে।’

নগর পুলিশ জানায়, বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল আছে প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার। বিশাল সংখ্যক এই পুলিশ কনস্টেবল কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চিত ও অবহেলিত হওয়ার অভিযোগ প্রায় শোনা যায়। অতিরিক্ত ডিউটি, আর্থিক অসচ্ছলতা ও অসুস্থতার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে বদলি, পদায়ন নিয়ে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা। ফলে এসবের প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে। অনেকে আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নিচ্ছেন।

সম্প্রতি খুলনায় নিজের রাইফেল দিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আত্মহত্যা করেন সম্রাট বিশ্বাস (২৭) নামে খুলনা রেলওয়ে পুলিশের এক সদস্য। এর আগে গত বছর একইভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন পলাশ সাহা (৩৭) নামে এক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি)। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে কর্মরত থাকাকালে একাধিক কনস্টেবল আত্মহত্যা করার খবর গণমাধ্যমে এসেছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, চলতি বছরে ৫ পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি,  ফেব্রুয়ারি,মার্চে একজন করে, এপ্রিল মাসে দুইজন। এর আগের বছর ২০২৫ সালে আত্মহত্যা করেছেন ১৩  পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে জানুয়ারিতে  একজন, ফেব্রুয়ারিতে তিনজন, মার্চ, এপ্রিল,  সেপ্টেম্বরে একজন করে, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে তিনজন করে। ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেছেন তিনজন। এর মধ্যে জানুয়ারি, মে ও অক্টোবরে একজন করে। এ নিয়ে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২০ পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন।