দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না আমচাষিদের

চলতি মৌসুমের শুরুতে গাছে গাছে মুকুলের সমারোহে আশার আলো দেখেছিলেন রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষিরা। গাছে গাছে ব্যাপকহারে মুকুল দেখে ভালো ফলনের আশা করেছিলেন সবাই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশা অনেকটাই হতাশায় পরিণত হয়েছে। এখন অনেক বাগানেই আশানুরূপ আম নেই। খরা আর পোকার আক্রমণে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় গাছ থেকে ঝরে পড়েছে আমের গুটি। এতে করে উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে, পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। সেখানে অনেক বাগানেই আমের উপস্থিতি বেশি থাকলেও বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েই গেছে।

রাজশাহীর কাটাখালি এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মৌসুমের শুরুতে যে পরিমাণ মুকুল এসেছিল, তাতে ভালো ফলনের আশা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে সেই হিসাব মিলছে না। এখন বেশিরভাগ গাছেই আম নেই। কোনো কোনো গাছে এক মণ আম হবে আবার কোনো গাছে ৫ কেজিও আম নেই। এখন আমরা বাজারের দামের হিসাব কষছি। কারণ যে কয়টা আম আছে তার যদি আবার দাম ভালো না মিলে তাহলে পুরোটাই লোকসান। আম ব্যবসায়ী আনারুল বলেন, রাজশাহীর বাগানগুলো কয়েক দফা হাত বদল হয়। কেউ ২ থেকে ৩ বছরের জন্য বাগান মালিকের কাছ হতে বাগান কিনে নেয়। আবার কেউ এক বছরের জন্যও নেন। ব্যবসায়ী আনারুল বলেন, তিনি এবারে ভালো মুকুল দেখে চড়া দামে গাছ কিনে কপাল চাপড়াচ্ছেন। যে গাছে ৫ মণ আমের আশা করেছিলেন এখন সেখানে দশ কেজিও আম নাই। তবে, কিছু কিছু গাছে যে আম আছে সেগুলো নিয়েই ভাবছেন তিনি। সেগুলোর দাম ঠিকঠাক পেলে বড় লোকসান থেকে বেঁচে যাবেন। আর দাম পড়ে গেলে তাও হবে না, বললেন আনারুল।

আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরেই আমের বাজার মন্দা যাচ্ছে। বিশেষ করে করোনার সময় থেকে যে খারাপ অবস্থার শুরু হয়েছে আর উন্নতি হয়নি। শালবাগানের আম ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, করোনার কারণে দ্ইু বছর আমের ব্যবসায় ধস ছিল। এর পরে দুই বছর রমজান মাসে আমের ভরা মৌসুম হওয়ায় চাহিদা কমে গিয়েছিল। এতে লোকসান গুনেছে চাষি ও ব্যবসায়ী। আবার তার পরে আমের ভরা মৌসুমে প্রচ- খরায় একসঙ্গে আম পেকে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হন তারা। রাজনৈতিক অস্থিরতাও আমের বাজারে খারাপ প্রভাব পড়ে। এমনি করে প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হয়েছে অথবা ভালো লাভের আশা পূরণ হয়নি চাষিদের।

চাষিরা বলছেন এবারে মুকুল আসার সময় থেকেই রাজশাহীর চাষিরা এখন হতাশ। এবারে কোরবানি ঈদের পর আমের ভরা মৌসুম সেই অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের আশা ছিল ভালো ফলন হবে সেই সঙ্গে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভালো দামও মিলবে। সব মিলে সুন্দর একটা মৌসুম পার হবে। কিন্তু ভালো কিছুর আশা তারা ছেড়েই দিয়েছেন। বরং ভালো দাম পেয়ে লোকসান কতটা কমানো যায় সেটিই তাদের নতুন ভাবনা। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ থেকে প্রায় ১২ লাখ টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।

কৃষি বিভাগে জানিয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই রাজশাহী ও আশপাশের জেলাগুলোতে পাকা আম বাজারে আসতে শুরু করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও বাজারজাত ঠেকাতে নজরদারি জোরদারের কথা বলা হয়েছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, অপরিপক্ব¡ আম যাতে আগেই সংগ্রহ না করা হয়, সে জন্য নির্ধারিত সময়সূচি দেওয়া হবে। আগামী ১০ মে এ নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কৃষি বিভাগ ও আমচাষি, ব্যবসায়ীদের সভায় ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার ঘোষণা করা হবে। কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়েও আমরা কাজ করছি। তিনি জানান, আম সংরক্ষণের বিকল্প পদ্ধতি যেমন আমসত্ত্ব, চিপস, জ্যাম ও জেলি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত যে আম গাছে রয়েছে তাতে আশানরূপ ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। উপযুক্ত দামও চাষিরা পাবেন বলে আশা করেন তিনি। এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, কৃষকদের নিজস্ব উদ্যোগে আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে বাজারদর কমে গেলেও তারা বিকল্প উপায়ে লাভবান হতে পারবেন।