বিজয়ের সরকার গঠন অনিশ্চিত

দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে নিজের অভিষেকেই বাজিমাত করেছেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া সি জোসেফ বিজয় (থালাপতি বিজয়)। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়ে তার দল তামিলাগা ভেট্টি কাঝাগাম (টিভিকে) একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তামিলনাড়ুর প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে টপকে টিভিকের এই সাফল্য যেমন সবাইকে চমকে দিয়েছে, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতলেও বিজয়ের দল সরকার গঠনের অনিশ্চয়তা বিস্মিতও করছে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর দাক্ষিণের রাজনীতিতে বইছে নাটকীয় পরিবর্তনের হাওয়া। যে ঘটনা এক দিন আগেও অসম্ভব মনে হচ্ছিল, বুধবার রাতে সেটিই জোরালো সম্ভাবনা হিসেবে সামনে এসেছে। রাজ্যে অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকেকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে দীর্ঘদিনের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দ্রাবিড় মুনেত্র কাঝাগম (ডিএমকে) এবং সর্বভারতীয় আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাঝাগম (এআইএডিএমকে) এক জোট হওয়ার পথ খুঁজছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ খবর জানিয়েছে। জানা গেছে, বিজয়ের দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে, বিকল্প সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিয়ে দুই শিবিরের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। ইন্ডিয়া টুডে বলছে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ‘জাতশত্রু’ দুই দলের এমন জোট গঠনের আলোচনা নজিরবিহীন।

এবারের নির্বাচনে রাজ্যটির পুরনো দুই দল ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-কে পরাজিত করে টিভিকে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে। তবে সরকার গঠনের জন্য ১১৮টি আসনের চেয়ে দলটি ১০ আসন পিছিয়ে আছে; যদিও ইতিমধ্যে বিজয়ের দলকে সমর্থন দিয়েছে রাজ্যটিতে ৫টি আসন পাওয়া কংগ্রেস। এতে সরকার গঠনের জন্য টিভিকের আসন সংখ্যা ১১৩ হলেও ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে ব্যর্থ বিজয়। কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়ার দাবি জানালেও রাজ্যপাল এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সরকার গঠনের জন্য রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করলেও, খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে বিজয়কে। গতকাল বৃহস্পতিবারও তামিলনাড়ুর লোক ভবনে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আর্লেকারের সঙ্গে ৪৫ মিনিট বৈঠক করেন টিভিকে প্রধান। রাজ্যপাল আর্লেকার জানিয়েছেন, সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পাওয়ার আগে বিজয়কে অন্তত ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থনের দালিলিক প্রমাণ জমা দিতে হবে। এর আগে, গত বুধবারও কংগ্রেসের সমর্থনপত্র রাজ্যপালের কাছে জমা দিয়ে সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছিলেন এই অভিনেতা-রাজনীতিক। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত না হওয়ায় রাজ্যপাল বিষয়টি নিয়ে সময় নিচ্ছেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।

বিজেপি বলছে, রাজ্যপাল সংবিধান এবং নিয়ম মেনেই পদক্ষেপ নেবেন। দলটির মুখপাত্র নারায়ণন তিরুপতি দাবি করেছেন, সরকার গঠনের পুরো প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিকভাবেই হবে। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি বলেন, লোকভবন বা রাজ্যপালকে নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি নেই; তিনি সংবিধান এবং নিয়ম অনুযায়ী চলবেন। তিনি আরও বলেন, জনগণ যেভাবে ভোট দিয়েছেন, তাতে কোনও একক দল পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তার ভাষায়, সংবিধান অনুযায়ী যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে পারে, তারই সরকার গঠনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবার কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আর ঠিক এই কারণেই লোকভবন প্রয়োজনীয় সময় নিচ্ছে। শপথ গ্রহণ ও সরকার গঠন নিয়ে টিভিকে নেতা ভিএস বাবু সাংবাদিকদের বলেন, দেখা যাক, খুব শিগগিরই এটি হবে। এরপর কী হয়, সেটাও দেখা যাবে। কেন্দ্রীয় চাপের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘যে বিষয়ে আমার ধারণা নেই, সে বিষয়ে আমি কথা বলব না’।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচিতদের ৬৫ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা: ভারতের অলাভজনক ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (এডিআর) নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গে সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে এডিআরের একটি প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, নির্বাচিত বিধায়কদের বেশিরভাগের নামেই আছে ফৌজদারি অপরাধের মামলা। আবার তাদের অনেকেই বেশ ধনী কোটির ঘরে তাদের সম্পদ। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী ২৯২ বিধায়কের এফিডেভিট নিরীক্ষা করেছে এডিআর; এদের মধ্যে ১৯০ জনের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা চলছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচিত বিধায়কদের মধ্যে ৪৯ শতাংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছিল। ২০২৬ সালে এসে তা ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বিজেপির ২০৬ বিজয়ীর মধ্যে ১৫২ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে (৭৪ শতাংশ)। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ জন নির্বাচিত বিধায়কের মধ্যে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে (৪৩ শতাংশ) চলছে ফৌজদারি মামলা। সার্বিকভাবে, ১৭০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে (৫৮ শতাংশ) গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। গতবারের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ছিল ৩৯ শতাংশ। বিজেপির ১৪১ জন ও তৃণমূল কংগ্রেসের ২৫ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের দায় আছে। অন্যান্য ছোট দলগুলোতেও একই ধারা লক্ষ করা গেছে। আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী) এবং অল ইন্ডিয়া সেকিউলার ফ্রন্টের নির্বাচিত বিধায়কদের প্রত্যেকের নামেই ফৌজদারি মামলা চলছে। তবে কংগ্রেসের দুই বিজেতার নামে কোনো মামলা নেই। ১৪ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং ৫৪ জনের বিরুদ্ধে ‘হত্যা প্রচেষ্টার’ মামলা চলছে। নারী নির্যাতনের মামলার মুখোমুখি হয়েছেন ৬৩ জন বিধায়ক। দুই জন বিধায়কের নামে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিজেপির জেতা ১০৫ আসনে এসআইআর বিতর্ক : ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘স্ক্রল’-এর এক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ১০৫টি আসনে বিজেপি যে ব্যবধানে জয় পেয়েছে, বিশেষ নিবিড় যাচাই (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় তার চেয়েও বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮৬টি আসন এমন, যেখানে বিজেপি আগে কখনোই জিততে পারেনি। গত সোমবার ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপি মোট ২০৬টি আসনে জয়ী হয়েছে অর্থাৎ, এই ১০৫টি আসন দলটির মোট জয়ের প্রায় অর্ধেক। ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ঐতিহাসিক দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পেয়েছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলটি। স্ক্রলের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, তৃণমূলের এই পরাজয়ে এসআইআর প্রক্রিয়াও বড় ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে স্ক্রল এই বিশ্লেষণ করেছে।

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর বা ভোটার তালিকা যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। ছয় মাস ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যার ফলে রাজ্যের মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ শতাংশ কমে যায়। বাদ পড়া এই ৯১ লাখ ভোটারের মধ্যে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য এখনো ঝুলে আছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। বাদপড়া ভোটারদের এই তথ্য সংকলন করেছে কলকাতার নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সবর ইনস্টিটিউট’। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেবল বিজেপিই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল। 

গত নির্বাচনে তৃণমূল জিতেছিল এমন ১২৯টি আসন এবার বিজেপির কাছে হাতছাড়া হয়েছে। এবার যে আসনগুলো তৃণমূলের হাত থেকে বিজেপির পকেটে গেছে, সেগুলোকে ‘সুইং সিট’ (যেখানে ভোটারদের মনোভাব বদলেছে) বলা হয়েছে। স্ক্রল দেখতে পেয়েছে, এমন ৮৬টি সুইং সিটে বিজেপির জয়ের ব্যবধান এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম। উদাহরণস্বরূপ দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর বিধানসভা আসনের কথা বলা যায়। কয়েক দশক ধরে এটি কমিউনিস্টদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৯৮৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এখানকার বিধায়ক ছিলেন। মমতার ক্ষমতা দখলের পরও এই আসনটি মূলত তৃণমূল এবং সিপিআই(এম)-এর মধ্যেই হাতবদল হয়েছে। ২০২১ সালে তৃণমূল এই আসনে জিতেছিল এবং সিপিআই(এম) হয়েছিল দ্বিতীয়। গত মাসে যাদবপুরে সরেজমিন ঘুরে স্ক্রলের মনে হয়েছিল, এবারও মূল লড়াই সিপিআই(এম) এবং তৃণমূলের মধ্যেই হবে। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাদবপুর থেকে ৫৬ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। আর সোমবারের ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপি এই আসনে ২৭ হাজার ৭১৬ ভোটের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো জয় পেয়েছে, যা বাদ পড়া ভোটারের অর্ধেকেরও কম।