ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব পালনে বড় চাপ সামলাতে হয়, সঙ্গে নিশ্চিত করতে হয় নিজের পারফরম্যান্স। অনেকেই নেতৃত্বভার সামলাতে গিয়ে খেই হারান, পারফর্ম করা ভুলে যান। যে কারণে এই গুরুদায়িত্ব পালন থেকে অনেকেই দূরে থাকতে চান। কিন্তু বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এখানে ব্যতিক্রম। অধিনায়ক শান্তই বেশি ভালো, চাপ সামলে নিজের ব্যাটকে কথা বলানোতেই যেন বেশি স্বাচ্ছন্দ্য তার। পঞ্চাশ পেরুনো বেশিরভাগ ইনিংসকে সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়ে আসছেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। গড়ছেন রেকর্ড, হয়ে উঠেছেন দায়িত্বশীল নেতা ও একজন সত্যিকারের পারফর্মার।
তবে বাংলাদেশ দলে এমন একজন ব্যাটসম্যানের উপস্থিতি নিত্যদিনের কোনো ঘটনা নয়। ৫টি হাফ সেঞ্চুরি করা শান্ত ৯টি সেঞ্চুরির মালিক। হাফ সেঞ্চুরির চেয়ে বেশি সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যান বাংলাদেশে আর দ্বিতীয়টি নেই। পঞ্চাশকে একশোতে নিয়ে যাওয়ার পথে শান্তর সর্বশেষ লড়াই ঘরের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন। মিরপুরে গতকাল দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি, ১৩০ বলেন করেন ১০১ রান। সেঞ্চুরির পথে ছিলেন শান্তর সঙ্গে ১৭০ রানের জুটি গড়া মুমিনুল হকও। কিন্তু শান্তর মতো তিন অঙ্ক ছুঁতে পারেননি অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান, ২০০ বলে ৯১ রানে থামেন তিনি। প্রথমবারের মতো টেস্টে ৯০ পেরিয়ে আউট হলেন তিনি।
‘টেস্ট ক্রিকেটার’-এর সিল গায়ে এঁটে যাওয়া মুমিনুল যৌথভাবে এই ফরম্যাটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিক। অন্যদিকে, ফর্ম বিবেচনায় বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দলের সেরা পারফর্মার শান্ত। এ দুজনের মধ্যে হাফ সেঞ্চুরি পেরিয়ে সেঞ্চুরি করা ও করতে না পারার তুলনায় ব্যাপারটি সহজভাবে পরিষ্কার করা সম্ভব। টেস্টে সর্বশেষ আট ইনিংসের চারটিতেই সেঞ্চুরি করেছেন শান্ত। এই আট ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি করলেই সেটাকে সেঞ্চুরিতে পূর্ণতা দিয়েছেন তিনি। সমান ইনিংসে মুমিনুল পঞ্চাশ ছুঁয়েছেন চারবার, প্রতিবারই যা থেকে হাফ সেঞ্চুরির গণ্ডিতে। এই হিসেবে অবশ্য কেবল মুমিনুলই নন, বিশ্ব ক্রিকেটের অনেকেই শান্তর চেয়ে পিছিয়ে। পঞ্চাশকে একশোতে রূপান্তর করার গড়ের হিসাবে অন্তত ২ হাজার টেস্ট রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তিনি তৃতীয়। সবার ওপরে থাকা স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের গড় ৬৯.০৫, দুইয়ে থাকা জর্জ হেডলির গড় ৬৬.৬৭। এরপরই থাকা শান্তর গড় ৬৪.২৮।
হাফ সেঞ্চুরিকে সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়াটা নিয়মে পরিণত করে ফেলেছেন শান্ত। এটাকে দলের অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা মনে করেন মুমিনুল। বিশ্বসেরা হওয়ার তাড়না থেকে শান্ত এভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি। প্রথম দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসা মুমিনুল বলেন, ‘এটা ভালো, কারণ একটা পর্যায় পর্যন্ত কাউকে তো নিয়ে যেতে হবে। ওকে দেখে হয়তো ভবিষ্যতে অন্য কেউ উন্নতি করবে। ওর চাহিদা এবং ক্ষুধা আছে দলের জন্য করার এবং বিশ্বসেরা হওয়ার। এই ইচ্ছাগুলো থাকলে এবং বাস্তবায়ন ঠিকমতো হলে এগুলো হয়।’
শান্ত পারলেও সেভাবে পারছেন না মুমিনুল। ১৩টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি ২৬টি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। হাফ সেঞ্চুরিকে সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে না পারার পেছনে মানসিক কারণ আছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে মুমিনুল বলেন, ‘হতে পারে মানসিক। আমি এখনো ধরতে পারিনি, ইনশাআল্লাহ ধরে ফেলব। আমি যখন ব্যাটিংয়ে নামি, তখন ১০০ করার চিন্তা করি না বরং সেশন ধরে খেলার চিন্তা করি। সেশন ধরে খেললে ১০০-১৫০ এমনিই হয়ে যায়। হয়তো ওই জায়গায় আরও বেশি মনোযোগী থাকতে হবে।’
টেস্ট নেতৃত্ব পাওয়ার আগে ৪৪ ইনিংসে শান্তর সেঞ্চুরি ছিল ৪টি, ব্যাটিং গড় ছিল ২৯.৮৩। অধিনায়ক হয়ে দুটোকেই ওপরের ধাপে নিয়ে গেছেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। ৩০ ইনিংসে করেছেন ৫টি সেঞ্চুরি, গড়ও তুলে নিয়ে গেছেন ৩৮.৪৮- এ। গতকালের সেঞ্চুরি দিয়ে বাংলাদেশের সব টেস্ট অধিনায়ককেও ছাড়িয়ে গেছেন আড়াই বছর ধরে টেস্ট নেতৃত্বে থাকা শান্ত। ৫টি সেঞ্চুরি নিয়ে তিনিই সবার ওপরে, ৪টি সেঞ্চুরির মালিক মুশফিকুর রহিমের জায়গা এখন দুইয়ে। অধিনায়ক হিসেবে ৩টি সেঞ্চুরি করেছেন মুমিনুল।