শাহিন শাহ আফ্রিদির করা ইনিংসের প্রথম ডেলিভারিটি সীমানা ছাড়া করলেন মাহমুদুল হাসান জয়। পরের বলটি লেগ বাইয়ে চার। বাংলাদেশের দাপুটে শুরুর আভাস মিললেও পরের বল থেকে ভিন্ন চিত্র। পাকিস্তানের পেসার শাহিনের তৃতীয় ডেলিভারিতে টের পাওয়া যায় বলের মুভমেন্ট। যে ডেলিভারিতে ব্যাট চালিয়ে যেন ধৈর্য হারানোর আগাম বার্তাই দিয়ে দেন জয়। একবার জীবন পেয়েও পথ দীর্ঘ করা হয়নি তার, টিকতে পারেননি অন্য ওপেনার সাদমান ইসলাম অনিকও। ৩১ রানে ২ উইকেট হারানো দলকে অবশ্য পথ হারাতে দেননি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক সৌরভ। এ দুজনের রেকর্ড জুটির পর মুশফিকুর রহিম ও লিটন কুমার দাসের ব্যাটে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে দারুণ একটি দিন কাটল টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের।
গতকাল মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া প্রথম টেস্টের প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের স্কোরকার্ডে জমা হয়েছে ৩০১ রান, উইকেট গেছে ৪টি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটিং কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করে আসা মুমিনুল একটুর জন্য ক্যারিয়ারের ১৪তম সেঞ্চুরি হাতছাড়া করেন, প্রথমবারের মতো আউট হন নার্ভাস নাইন্টিজে। দিনের বাকিটা সময় পার করেন মুশফিক ও লিটন। মুমিনুলের সমান ও বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ১৩টি সেঞ্চুরির মালিক মুশফিক অপরাজিত আছেন ৪৮ রানে, লিটন অপরাজিত আছেন ৮ রানে। এই ইনিংস দিয়ে সেঞ্চুরিতে মুমিনুলকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ মুশফিকের সামনে, এর জন্য তার দরকার আরও ৫২ রান।
যেকোনো ম্যাচের আগে মিরপুরের উইকেট আলোচনায় থাকে, এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। উইকেট দেখে ধারণা মিলেছিল, বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্তও ইঙ্গিত দেন স্পোর্টিং উইকেটের। যেখানে ব্যাটসম্যানদের জন্য থাকবে চ্যালেঞ্জ, পেসাররা পাবেন সহায়তা। উইকেটের সুবিধা কাজে লাগিয়ে পঞ্চম ওভারেই উইকেটের সম্ভাবনা তৈরি করেন শাহিন। কিন্তু নিজেদের ভুলে এ দফায় জীবন ফিরে পান জয়। তার ব্যাটের কানায় লেগে বল পেছনে গেলে শুরুতে ক্যাচ নেওয়ার চেষ্টা করেন আবদুল্লাহ ফজল, কিন্তু ক্যাচ না নিয়ে থেমে যান তিনি। এতে বিভ্রান্ত হন প্রথম সিøপে থাকা শান মাসুদ, হাতে এলে ক্যাচটি নিতে পারেননি তিনি। এ দফায় বেঁচে যান ৪ রানে ব্যাটিং করতে থাকা জয়।
জয়ের নতুন জীবন অবশ্য দীর্ঘ হয়নি। শুরু থেকেই নড়বড়ে থাকা ডানহাতি এই ওপেনার সপ্তম ওভারেই ফিরে যান। শাহিনের বলেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে থামেন ১৯ বলে ৮ রান করা জয়। অন্য ওপেনার সাদমানও থিতু হতে পারেননি, দলীয় ৩১ রানে তাকে ফেরান পাকিস্তানের আরেক পেসার মোহাম্মদ আব্বাস। ৩০ বলে ১৩ রান করেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে এমন শুরু যেকোনো দলের জন্যই বড় ধাক্কা। এই ধাক্কা সামলে উঠতে অবশ্য সময় নেননি শান্ত ও মুমিমুল। সাবলীল ব্যাটিংয়ে মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়ে নেন শান্ত, তাকে যোগ্য সঙ্গ দিতে শুরু করেন মুমিনুল।
সঙ্গী ধীরস্থির থাকলেও দাপুটে ব্যাটিং করতে থাকেন শান্ত। তার ব্যাটেই মূলত এ জুটির রান দ্রুতগতিতে এগোতে থাকে। তৃতীয় উইকেটে এ দুজন যোগ করেন ১৭০ রান। যা তৃতীয় উইকেটে বাংলাদেশের তৃতীয় সেরা জুটি এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে সেরা। দলকে আলোর পথে ফেরানোর লড়াইয়ে অসাধারণ ব্যাটিং করেন শান্ত। পাকিস্তানি পেসারদের বলের মুভমেন্ট ও আনইভেন বাউন্স সামলে নেতার মতোই খেলা বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান দারুণ সব শটে নবম টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। তিন অঙ্কে পৌঁছাতে তার খরচা ১২৯ বল, ১২টি ৪ ও ২টি ছক্কায় সাজান ইনিংসটি। সেঞ্চুরি পূরণের পরের বলেই মোহাম্মদ আব্বাসের শিকারে পরিণত হন আর এক রান যোগ করা শান্ত।
এই সেঞ্চুরিতে দেশের সব অধিনায়ককে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। অধিনায়কদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫টি সেঞ্চুরির মালিক এখন তিনি। ৪টি সেঞ্চুরি নিয়ে তার পরই সাবেক অধিনায়ক মুশফিক। হাফ সেঞ্চুরিকে সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়াতে অনবদ্য বাংলাদেশ অধিনায়ক। ৪০ টেস্টের (চলমান টেস্টসহ) ক্যারিয়ারে ৫টি হাফ সেঞ্চুরি করা শান্তই ৯টি সেঞ্চুরির মালিক। দারুণ ছন্দে থাকা এই ব্যাটসম্যান সর্বশেষ ৮ ইনিংসের মধ্যেই ৪টি সেঞ্চুরি করেছেন। তার দারুণ এই সক্ষমতা তাকে বসিয়েছে অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, জর্জ হেডলির পাশে। পঞ্চাশকে ১০০-তে রূপান্তর করার গড়ের হিসাবে অন্তত ২ হাজার টেস্ট রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শান্ত তৃতীয়। সবার ওপরে থাকা ব্র্যাডম্যানের গড় ৬৯.০৫, দুইয়ে থাকা হেডলির গড় ৬৬.৬৭। এর পরই থাকা শান্তর গড় ৬৪.২৮।
প্রথমবারের মতো নার্ভাস নাইন্টিজে আউট হওয়া মুমিনুল এদিন কিছুটা ব্যতিক্রমী ছিলেন। অন্যান্য সময়ের চেয়ে ধীরগতিতে ব্যাটিং করেছেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। ১০ চারে ৯১ রান করা মুমিনুল খেলেছেন ২০০ বল। শান্তর মতো ব্যাট হাতে ছন্দে থাকা মুমিনুল শেষ চার ইনিংসের সবকটিতেই করলেন হাফ সেঞ্চুরি। এসব ইনিংসের কোনোটি সেঞ্চুরির পূর্ণতাও পেতে পারত। যদিও এ নিয়ে আক্ষেপ নেই তার। রান করা ও দলের জন্য অবদান রাখাই তার কাছে সবকিছু। দিনশেষে নিজের পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে মুমিনুল বললেন দলের লক্ষ্যের কথাও, ‘আমার ইচ্ছা ছিল চার থেকে পাঁচ সেশন ব্যাটিং করব। চার পাঁচ সেশন ব্যাটিং করলে ৪০০ রান এমনি হয়ে যাবে। কাল সকালের এক ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। উইকেট না হারিয়ে ওই সময়টা পার করতে পারলে ৪০০-৫০০ রান হতে পারে। এখন উইকেটে অনেক কিছু হচ্ছে, তাই প্রথম এক ঘণ্টা ভালো খেলাটা জরুরি।’