ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতারা বিভিন্ন সময়ে ভারতের মুসলিমদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে যখন বিজেপির সরকার বসতে যাচ্ছে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইস্যুটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের সীমান্তে সতর্কতা বৃদ্ধির পদক্ষেপের কথা এসেছে। প্রশ্ন উঠেছেÑ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসার ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা?
বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রাতারাতি পরিবর্তন হয় না। নির্বাচনের সময়ের ভোটের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে পরিবর্তন করে না বা প্রভাব ফেলে না বলে তারা মনে করেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হলেও সেটি পার্শ্ববর্তী দেশকে প্রভাবিত করে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকারকে সচেতন থাকতে হবে বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এটা ঠিক, যারা রাষ্ট্র গঠন করে সাম্প্রদায়িক ইনসিডেন্টের ক্ষেত্রে তাদের একটা প্রচ্ছন্ন সাপোর্ট বা ভূমিকা থাকতে পারে।’ তবে এই বিশ্লেষক মনে করেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত হয়। আমার মনে হয় না, কোয়ালিটেটিভ পরিবর্তন আসবে।’
‘কোয়ালিটেটিভ পরিবর্তন’ না আসার কারণ হিসেবে অধ্যাপক ইয়াসমিন জানান, ‘শীর্ষপর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে যদি আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকে, তাহলে ফরেন পলিসির ক্ষেত্রে আমূল কোনো পরিবর্তন আসবে না।’
সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমদ অবশ্য মনে করছেন, দুই দেশই সম্পর্কোন্নয়নের ইঙ্গিত দিলেও এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ফয়েজ আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সরকারের সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দুপক্ষ থেকেই ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে সুসম্পর্কের। কিন্তু এটার জন্য দুই দেশের মাঝে উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময় হলে বুঝতে পারব সেই অঙ্গীকারটা আছে এবং তার পরে নির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে অগ্রগতির চিন্তা তখন করা যাবে।’
তিস্তাচুক্তি প্রসঙ্গ : বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি, যেটি অনেক দিন ধরে ঝুলে আছে। ভারতের নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার এই চুক্তিতে রাজি হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির রাজ্যসরকার রাজি ছিল না বলে বরাবরই সেই রাজ্যসরকারের দোহাই দিয়ে আসছিল কেন্দ্রীয় সরকার।
তবে এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে এখন রাজ্যেও ক্ষমতায় বসছে বিজেপি। ফলে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তিতে রাজ্যে বিজেপির জয় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেই সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন দুই বিশ্লেষক।
অধ্যাপক ইয়াসমিন বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জির ওপর তখন সুযোগ বুঝে দোষা চাপানো হয়। কারণ তিস্তার সঙ্গে শুধু রাজ্যসরকার নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের স্বার্থও কিন্তু জড়িত। কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়া কোনো চুক্তিই হওয়া সম্ভব নয়। যেহেতু এটা বিজেপি নিয়ন্ত্রিত সরকার ছিল না, তাই মমতাকে এটার জন্য দায়ী করা বিজেপির পক্ষে সহজ ছিল। কিন্তু ‘মমতা ব্যানার্জি তিস্তাচুক্তির ব্যর্থতার জন্য এককভাবে দায়ী নন; বরং পুরো স্ট্রাকচার দায়ী’ বলে মনে করেন অধ্যাপক ইয়াসমিন।
সাবেক কূটনীতিক ফয়েজ আহমদ অবশ্য মনে করেন, এখন তিস্তাচুক্তি নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখতে পাওয়া যাবে। আগে বিজেপির সরকার তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছিল।
‘এখন তো কেন্দ্র ও প্রদেশে একই সরকার। সুতরাং সমস্যাটা আগের তুলনায় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বরং আমি মনে করি, ইতিবাচক অগ্রগতি আমরা দেখতেও পারি’ বলেন ফয়েজ আহমদ। তবে এই অগ্রগতি মূলত দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কোন্নয়নের ওপর নির্ভর করে বলেও মনে করেন তিনি।
সীমান্ত নিরাপত্তা : চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্কের টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাব পড়েছিল সীমান্তে নিরাপত্তাসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকার সীমান্ত নিরাপত্তাসহ সব ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে আলোচনা করতে ইতিবাচক বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তাদের মতে, একটি রাজ্যসভার নির্বাচনের ফলের ওপর ওই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ভর করে না।
‘একটা রাষ্ট্রের ফরেন পলিসি একটা গ্র্যান্ড ডিজাইন। সেই কারণে আমরা দেখি যে, তার ফরেন পলিসির জন্য যদি মনে হয় যে, সীমান্ত সেনসেটাইজ করলে তার সুবিধা হয়, তাহলে করবে। সে ক্ষেত্রে রাজ্যসরকার তার পক্ষে হলে সেটা সহজ হয়’ বলেন অধ্যাপক ইয়াসমিন।
তবে ফয়েজ আহমদ মনে করেন, সাময়িকভাবে উত্তেজনা এখন হলেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর পরে সীমান্তের এপাশ-ওপাশে বড় রকমের আর কোনো ঝামেলা বা উত্তেজনা হবে না।
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা : পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমানা দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটারের কিছু বেশি। বাংলাদেশ ও ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম বর্ডার বা সীমানা ভোগকারী দেশ। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিজেপিনিয়ন্ত্রিত একাধিক রাজ্যেই মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন হতে দেখা গেছে। এমনকি বাংলাদেশও বিভিন্ন সময়ে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইয়াসমিন বলেন, ‘এটার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, দুটি দেশ যেহেতু ওয়ার্ল্ডের ফিফথ লার্জেস্ট বর্ডার শেয়ার করে, সেহেতু তাদের ভেতরে ডোমেস্টিক অ্যাফেয়ার্স কী হচ্ছে, সেটার প্রভাব আরেকটি দেশে পড়ে।’
সম্প্রতি জয়লাভের পর একটি মাংসের দোকান বিজেপির সমর্থকরা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই কারণে অধ্যাপক ইয়াসমিন ইতিবাচকভাবে দেখতে চান উল্লেখ করে বলেন, ‘দ্রুত পদক্ষেপগুলো একটা আশ্বাস দিতে পারে।’
আলোচনায় পুশইন : নির্বাচনী প্রচারের সময় বিজেপি নেতারা সে দেশের মুসলিমদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বা পুশইন করা হবে বলে হুমকি দিয়েছিলেন। আর এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সীমান্তে সতর্কতা বৃদ্ধির পদক্ষেপের কথা এসেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুশইন ইস্যুতে সীমান্তে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বা বিজিবিকে সতর্ক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
বিজেপির জয়ে বাংলাদেশে পুশব্যাক বাড়তে পারে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ফয়েজ আহমদ বলেন, ‘আমরা বিজিবিকে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে সীমান্তে তারা একটু সতর্ক থাকে। কারণ সে রকম কোনো সম্ভাবনা দেখি না, যদি হয় যাতে তারা অ্যাড্রেস করতে পারে। আমার ধারণা, সে রকম কিছু ঘটবে না।’
সাবেক কূটনীতিক ফয়েজ আহমদ বলেন, ভোটের রাজনীতিতে করা কোনো মন্তব্য পরে সে দেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে না। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা করবে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
বাংলাদেশ সরকারের মনোভাব : চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনার কার্যালয়ে হামলা ও পতাকা পোড়ানো, ভারতের ভিসা বন্ধ হওয়াসহ নানা ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করে। কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার ও ভারত সরকারÑ দুপক্ষই সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে বলা হচ্ছে। তবে নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের করা বাংলাদেশের সম্পর্কে নানা ধরনের মন্তব্য এ সম্পর্ক নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি করে।
গত সোমবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশ একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।
সংখ্যালঘু মুসলমানদের অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার বিষয়ে বিজেপি নেতাদের বক্তব্যের সম্পর্ক সংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি ওই কথা বলেন।
‘বিজেপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল হোক, আমাদের দিক থেকে ওদের সঙ্গে পানির ইস্যু আছে, পুশব্যাকের যে ইস্যুটা বললেন, ওটা আছে। আরও অনেক ইস্যু আছে। সেই ইস্যুগুলো তো আমাদের রয়ে যাচ্ছে। সেগুলো যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে’ বলেন শামা ওবায়েদ।
পর দিন মঙ্গলবার ঢাকায় জেলা প্রশাসক সম্মেলনের আরেকটি অনুষ্ঠানের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ এই ফরেন পলিসি অনুযায়ী বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেবে বলেও উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
‘বাংলাদেশ প্রথম বা ফার্স্টনীতিতে আমাদের ফরেন পলিসি, যে সরকারই আসুক না কেন, সেই ইস্যুতে আমাদের ফরেন পলিসি পরিবর্তন হবে না। আমরা আমাদের ফরেন পলিসি নিয়েই সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে আগাব’ বলেন শামা ওবায়েদ।