চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৪০ কোটি টাকা ছাড় করেছে সরকার। গত সপ্তাহের জলাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনার পর ত্বরিত গতিতে এই অর্থ ছাড় দেওয়া হলো। এ নিয়ে চলতি অর্থবছরে সরকার ৫৮২ কোটি টাকা ছাড় দিল। আগামী জুনের আগে আরও ১৭০ কোটি টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন। তিনি জানান, এসব টাকা পাওয়া গেলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের এ মেগা প্রকল্পের কাজ অনেকাংশে শেষ করা যাবে।
কবে নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ শেষ হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চলতি বর্ষার আগে আর কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আগামী বর্ষার আগে প্রকল্পের কাজ পুরো শেষ হয়ে যাবে।’
গত সপ্তাহের দুদিন ২৮ ও ২৯ এপ্রিল জলাবদ্ধতায় নাকাল ছিল চট্টগ্রাম মহানগর। জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও এ জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের বিষয়টি আলোচিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্ভোগের জন্য চট্টগ্রামবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য। গঠন করা হয় ১৯ সদস্যের একটি মনিটরিং কমিটি। এরপর দ্রুততার সঙ্গে অর্থ ছাড় দেওয়া হয়। প্রকল্প পরিচালক আহমেদ মাঈনুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানান, গত সপ্তাহের শেষ দুদিন ঢাকায় অবস্থান করে বৃহস্পতিবার তিনি ১৪০ কোটি টাকা ছাড় দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।
জলাবদ্ধতাবিষয়ক মনিটরিং কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জলাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে খালে বাঁধ দিয়ে সব ধরনের উন্নয়নকাজ বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। এ নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রকল্পের আওতায় নগরজুড়ে থাকা প্রায় অর্ধশত বাঁধ কেটে দিয়ে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় নতুন করে ছাড় পাওয়া টাকা দিয়ে কোন ধরনের কাজ করা হবে জানতে চাইলে প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। চলতি অর্থবছরে আমরা সরকারের কাছ থেকে ৯৬০ কোটি ৮২ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৪৪২ কোটি টাকা। এতে ঠিকাদারের টাকা বকেয়া রেখেই শুষ্ক মৌসুমে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। এখন নতুন করে ছাড় হতে যাওয়া ১৪০ কোটি টাকা দিয়ে ঠিকাদারের বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি প্রকল্পের অন্যান্য কাজ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক বলেন, বৈশাখের বৃষ্টিতে সৃষ্ট দুর্ভোগের পর হিজরা খাল, জামালখান খাল ও রামপুর খালে কোনো কাজ করতে নিষেধ করা হলেও প্রকল্পের আওতায় আরও অনেক কাজ রয়েছে। খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রেখে আমরা সেই কাজগুলো অব্যাহত রাখব।
প্রকল্পের আওতায় নিয়োজিত প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসনের আওতায়
পৃষ্ঠা ২ কলাম ৪ >পাওয়া গেল ১৪০
নগরীর ৩৬টি খাল রয়েছে। অনেক খালের উজানে রিটেইনিং দেয়াল নির্মাণ কিংবা খালের পাশে রাস্তা নির্মাণের কাজ বাকি রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৯৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজগুলো আগামী বর্ষার আগে শেষ করতে হলে অবশ্যই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
সিডিএর প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালে উন্নয়নকাজ চলমান থাকলেও নগরীতে মোট ৫৭টি খাল রয়েছে। বাকি খাল ও নালাগুলো ভরাট থাকায় কম সময়ে অধিক বৃষ্টি হলেই নগরী জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এসব নালা ও খালের জন্য গত মাসে সরকারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ৪৫ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এখন মেগা প্রকল্পের বিশেষ বরাদ্দের টাকা দিয়ে কোন কোন কাজ করা হবে, তা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী ও জলাবদ্ধতা নিরসনে গঠিত ১৯ সদস্যের মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন জানান, বিশেষ বরাদ্দ পাওয়া টাকা দিয়ে চট্টগ্রাম শহরের ৩৫টি খাল এবং ৬০০ নালা থেকে মাটি উত্তোলনের কাজ করা হবে। এ ছাড়া নালা ও খালগুলো দিয়ে যাতে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকে, সেসব বিষয়ে দ্রুত কার্যক্রম করা হবে।
চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সিডিএর ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পটি ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকে পাস হয়। পরে ২০২৩ সালে বাজেট বাড়িয়ে এই প্রকল্পের আকার ৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা করা হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড ২০১৮ সালের এপ্রিলে নালা-নর্দমা পরিষ্কারের মাধ্যমে কাজ শুরু করে। সেই থেকে নগরীর ৩৬টি খাল সংস্কার ও পুনঃখননের কাজ এবং খালের উভয় পাশে স্থাপনা ভেঙে সম্প্রসারণের কাজ করে আসছে সেনাবাহিনী।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি নগরীর বহদ্দারহাট থেকে বারৈয়পাড়া পর্যন্ত একটি নতুন খাল খননের আলাদা প্রকল্প রয়েছে। সিটি করপোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডেরও প্রকল্প চলমান আছে। সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প শেষ হলে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।