বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ হাটবাজার। প্রাচীণকাল থেকে গ্রামবাংলার এ হাটবাজারগুলো ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এক সময়ে গ্রামবাংলার বিভিন্ন স্থানের নামকরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব ছিল হাটবাজারের নাম। তেমনই একটি হলো গাজীপুর মহানগরীর গাছা বাজার। যে স্থানটিতে জড়িয়ে রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ এবং বেদখলের জন্য আজ এ যুগে এসে বিলুপ্তির পথে বাজারটি।
জানা যায়, ব্রিটিশরা বাংলাদেশে ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর শাসন করে। পরে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে জমিদারি প্রথা বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয় ১৭৯৩ সালে। তৎকালীন গাজীপুরের গাছার জমিদার অর্দ্ধেন্দুনাথ রায় চৌধুরী তার বাড়ির পাশে একটি পুরনো পাকুড় গাছের নিচে এবং খাল থেকে ৫০০ মিটার দূরে বাজার বসান। ওই গ্রামের নাম অনুসারে বাজারের নাম দেওয়া হয় ‘গাছা বাজার’। জমিদারি প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫০ সালে অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয়। এখন প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েক ঘণ্টার জন্য বসে এ বাজার।
স্থানীয় বর্ষীয়ানরা জানান, এক সময় প্রতি সপ্তাহে রবি ও বুধবার হাট বসত ‘গাছা বাজারে’। মানুষ এ দুদিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি-পণ্য বেচাকেনা করতে অনেক দূর থেকে ছুটে আসত। বাজার হয়ে উঠত রীতিমতো মিলনমেলা। একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন। এ বাজারের বেশ নাম ছিল। ঢাকার সাভার, আশুলিয়াসহ গাজীপুরের তৎকালীন আশপাশের প্রায় ৫০ গ্রামের মানুষ এ বাজারে এসে নিত্যপণ্য কিনে নিতেন।
পুরনো ইতিহাস ফেলে ৩০-৩৫ বছর আগে থেকে বাজারটি প্রতিদিন শুধু ভোরে শুরু হয়ে সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে শেষ হতো।
তারা বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে শাক-সবজি, ধানসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বাজারে যেতাম। মাথায় করে বাজারে নিয়ে বিক্রি করতাম। বিক্রি করা টাকা দিয়ে আবার টুকরি করে পুরো এক সপ্তাহের বাজার নিয়ে আসতাম। তখন আলাদা আনন্দ ছিল। এখন এগুলো শুধুই স্মৃতি। তবে কালের বিবর্তনে বিলীন হচ্ছে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য। ফলে প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। এখন আর কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে দাম যাচাই করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। পাইকাররাই জমি থেকে কিনে নিয়ে যান। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আর এ বাজারে ছুটে আসেন না, যে কারণে এখন এ বাজারে আগের সেই জৌলুস নেই।’
স্থানীয় নরেন্দ্র ও সুচিত্র রবিদাস জানান, আমাদের পূর্বপুরুষের কাছে শুনেছি এ বাজারটি চালুর অনেক পরে টঙ্গী বাজার চালু হয়। সে সময়ে এ বাজারে গরু, ছাগল, ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিক্রি হতো। তুরাগ নদী থেকে বাজার সংলগ্ন খালে এসে ভিড়ত ট্রলার। ওই ট্রলারে কৃষকের পণ্যসহ দূরদূরান্ত থেকে আসতেন ক্রেতারা। আবার অনেকে পায়ে হেঁটে মাথায় পণ্য নিয়ে আসতেন বাজারে। অনেক জমজমাট ছিল এ গাছা বাজারটি। বর্তমানে অনেক পরিবারের সদস্যরা কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছেন। যে স্থানটিতে বাজার বসে তার ঠিক আধা কিলো সামনে গিয়ে পাইকাররা ভ্যানগাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। যার ফলে পাশর্^বর্তী গ্রাম পলাশোনা থেকে কৃষকরা যেসব সবজি নিয়ে বাজারে আসতে থাকেন তাদের থেকে পাইকাররা কিনে নেন। কৃষকরা বাজার পর্যন্ত আসতে পারেন না। তাই সাধারণ ক্রেতাদের বাধ্য হয়ে অতিমূল্যে পাইকারদের কাছ থেকে সবজি কিনতে হয়। যে কারণে স্থানীয়রা এক প্রকার ইচ্ছে করেই গাছা বাজারে আসেন না। গাছা এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক নিরঞ্জন কুমার দত্ত জানান, এক সময় আশপাশের লোকজন নৌকাযোগে, পায়ে হেঁটে গাছা বাজারে আসা-যাওয়া করতেন। বড় বাজার হওয়ায় বিভিন্ন লোকজন এসে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। এখন এসব কেবলই স্মৃতি। হাটবারের কদর নেই। বর্তমানে এলাকার প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ছোট ছোট অনেক বাজার। বর্তমানে শিল্প নগরী হওয়ায় প্রতিটি বাড়ির পাশে গড়ে উঠেছে দোকানপাট। মানুষ এখন আর দূরে বাজার করতে যান না। কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পাওয়া যায়। তাই কমেছে সাপ্তাহিক হাট-বাজারের কদর। বিলীন হয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী গ্রামীণ হাটবাজার। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার বলেন, দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতির একটি অংশ বহন করে গ্রামীণ হাট-বাজার। কালের বিবর্তনে এ ঐতিহ্য এখন আর দেখা যায় না। বর্তমান প্রজন্ম হাটবাজারের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানেই না। এখন বাজারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বারের প্রয়োজন হয় না।