মেহেরপুরে ভ্যানগাড়ি চুরির ঘটনায় জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে একটি পরিবার। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কেনা সেই ভ্যানের আয়ে চলত ৪ প্রতিবন্ধীসহ সাত সদস্যের সংসার। এখান থেকে আয় দিয়েই পরিশোধ হতো ঋণের কিস্তি। ভ্যানটি চুরি হওয়ার পর বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে পরিবারটির। তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য। চুরি যাওয়া ভ্যানটি উদ্ধারে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধলা গ্রামের অসহায় ভ্যানচালক আব্দুল লতিফ ভ্যান হারিয়ে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তার গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, পলিথিনে মোড়ানো বাড়ির চালা ও প্রাচীর। ছোট্ট এক কাঠা জমির ওপর এই কুঠরিতে বসবাস চার প্রতিবন্ধী সন্তান, স্ত্রীসহ ৭ সদস্যের। এই পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল একটি ব্যাটারিচালিত পাখিভ্যান। এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এক লাখ ৩০ হাজার টাকায় ভ্যানটি কিনেছিলেন ছয় মাস আগে। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ভ্যান চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত সাত সদস্যের সংসার। সেই টাকাতেই পরিশোধ করতেন এনজিওর সাপ্তাহিক কিস্তি। কিন্তু একটি মুহূর্তের অসতর্কতায় ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবারটি।
ভ্যানচালক আব্দুল লতিফ জানান, ১০ দিন আগে বাড়ির উঠানে ভ্যানটি রেখে পাশেই পলিথিনে মোড়ানো ছোট্ট ছাপড়ির নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। ক্লান্ত শরীর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, তা নিজেও বুঝতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর ঘুম ভাঙতেই দেখেন, তার একমাত্র সম্বল ভ্যানটি নেই। চুরি করে নিয়ে গেছে চোর। এরপর থেকেই অন্ধকার নেমে এসেছে পরিবারটিতে। সাত সদস্যের পরিবারে চারজনই প্রতিবন্ধী। স্ত্রী ও দুই ছেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ছেলের স্ত্রীও শারীরিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের সবাই নির্ভরশীল ছিলেন আব্দুল লতিফের আয়ের ওপর। কিন্তু ভ্যান হারানোর পর গত ১০ দিন ঠিকমতো রান্না হয়নি তাদের ঘরে। কখনো প্রতিবেশীদের সাহায্যে, কখনো না খেয়েই কাটছে দিন। এর ওপর রয়েছে এনজিওর ঋণের বোঝা পরিশোধের চিন্তা। কারণ এনজিওর কিস্তির টাকা নিয়মিত শোধ দিতে না পারলে হয়তো মাথা গোজার ছোট্ট কুঠরিটিও হারাতে হতে পারে তাদের।
এলাকাবাসী নাজিম উদ্দিন জানান, এই জমানায় এত গরিব খুব কম মানুষই। একমাত্র সম্বল ভ্যান চুরি যাওয়ার পর পরিবারটির দুর্দশা চোখে দেখার মতো না। এখন প্রতিবেশীদের সাহায্যে চলছে তাদের আহার। গাংনী থানার ওসি উত্তম কুমার দাস জানান, চুরি যাওয়া ভ্যান গাড়িটি উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে। তা ছাড়া ভ্যান হারিয়ে পথে বসে যাওয়া পরিবারটির মানবিক দিক বিবেচনায় গাংনী থানা পুলিশ কিছু খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। সেই সহায়তায় কোনোভাবে দিন পার করছেন পরিবারটি। প্রতিবেশীরাও বলছেন, এমন অসহায় পরিবার খুব কমই আছে। এখন পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো সবার জরুরি হয়ে পড়েছে।
গাংনীর কাথুলী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি পরিবারটিকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার জন্য।’ গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পরিবারটিকে বাঁচাতে দ্রুত চুরি যাওয়া ভ্যান উদ্ধার অথবা নতুন ভ্যানের ব্যবস্থাসহ এনজিওর ঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করা জরুরি। কারণ দান-খয়রাতে জীবন চালানো কষ্টকর। প্রশাসন দ্রুতই পরিবারটিকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।’