নেত্রকোনার পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা

মাত্র ১২ কিলোমিটার রেললাইন হলেই পাল্টে যাবে দৃশ্যপট

পাহাড়ি খরস্রোতা সোমেশ্বরী নদী আর ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই পণ্য) সাদা মাটির রঙিন সৌন্দর্যের কারণে নেত্রকোনার দুর্গাপুর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে যেন স্বর্গরাজ্য। এখানকার সীমান্তের পাহাড়ি দৃশ্য যে কারো মন কাড়ে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানকার পর্যটন যেন বরাবরই পিছিয়ে।

তবে থমকে থাকা পর্যটন নতুন করে দেখছে আশার আলো। জারিয়া থেকে দুর্গাপুরের দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার। আর এই ১২ কিলোমিটার রেললাইনের সাথে সংযুক্ত করা গেলেই পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি এবং যাতায়াতে খোলা যাবে নতুন সম্ভাবনা।

দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম আর দাবি আদায়ের মধ্য দিয়ে জারিয়া থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও ধোবাউড়ার কয়েক লাখ বাসিন্দা। সেই আশায় এবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন এখানকার বাসিন্দারা।

নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে দুর্গাপুর-কলমাকান্দার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যেন আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন। বুধবার (১২ মে)  জারিয়া থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ পরিদর্শনে আসছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম, রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন সহ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বেলা ১২ টায় জারিয়া ঝানজাইল রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনের কথা রয়েছে তাদের। এরপর বেলা তিনটায় দুর্গাপুর জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে সুধীজনদের সাথে মতবিনিময়ের কথা রয়েছে। এরই মধ্য দিয়ে ১১০ বছরের পুরোনো এক স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে বলে আশাবাদী এই অঞ্চলের বাসিন্দারা।

উল্লেখ্য, ১৯১২ থেকে শুরু হয়ে ১৯১৮ সনে বাণিজ্যিকভাবে শ্যামগঞ্জ থেকে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল হয়ে দুর্গাপুরে রেললাইন সম্প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং রেলওয়ের কর্মচারীদের আবাসন নির্মাণের জন্য জায়গা অধিগ্রহণ এবং রেললাইন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল রাস্তা নির্মাণের কাজ। পরবর্তীতে জারিয়া আনসার ক্যাম্পের পাশ দিয়ে রেললাইনটি জারিয়া স্টেশনে পৌঁছার আগেই ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে বাঁক নেয়। ওই বাঁক থেকে সোজা অংশ কংস নদ পার হয়ে দুর্গাপুরের দিকে রেল নেওয়ার জন্য মাটিকাটাও শুরু হয়েছিল।

পরবর্তীতে ১৯৪০ দশকের 'টংক আন্দোলন', কৃষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর এলাকায় পাকিস্তানি অনুপ্রবেশের জেরে যুদ্ধ, ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কারণে ও পারিপার্শ্বিক নানা জটিলতায় এই অঞ্চলটিকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়নি তৎকালীন পাকিস্তান রেলওয়ে বা আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। স্বাধীনতার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জোরালো কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় আজও দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারিত হয়নি।

স্থানীয়দের মতে, জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন বাস্তবায়ন শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি পুরো নেত্রকোনা অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, পর্যটন বিকাশ এবং শিল্পায়নের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পাশাপাশি এতে করে স্বল্প খরচেই রেলপথ ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রবীণ সংস্কৃতিজন বীরেশ্বর চক্রবর্ত্তী বলেন, "আমার মৃত্যুর আগে দুর্গাপুরে রেললাইন সম্প্রসারণ দেখে যেতে পারব—এটা কোনোদিন কল্পনা করিনি। অত্র এলাকা থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকারের একান্ত প্রচেষ্টায় আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। রেললাইন সম্প্রসারণ হলে অত্র এলাকার আমূল পরিবর্তন ঘটবে।"

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহমেদ সাদাত জানান, "দুর্গাপুর উপজেলায় মাত্র তিন দিন হলো যোগদান করেছি। এর মাঝেই সুসংবাদ পেলাম, দুর্গাপুর সীমান্তবর্তী উপজেলায় রেললাইন সম্প্রসারণ হবে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। রেললাইন চালু হলে দুর্গাপুর উপজেলা একটি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে এবং এখানকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে।"